মোবাইল ফোন চুরি এখন বিশ্বব্যাপী এক মহামারি রূপ নিয়েছে, তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ইউরোপের মধ্যে যুক্তরাজ্য, বিশেষ করে এর রাজধানী লন্ডন, এই অপরাধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কারণে এই অপরাধের হার বাড়ছে, যা একটি লাভজনক চোরাবাজার তৈরি করেছে। এই চোরাবাজারে চুরি করা ডিভাইসগুলো প্রায়ই বিদেশে পাচার করা হয়। ফোন চুরির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে, যা লন্ডনকে ইউরোপের সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে এবং ঢাকার মতো একটি প্রধান দক্ষিণ এশীয় শহরের পরিস্থিতির সঙ্গে এর তীব্র বৈপরীত্য দেখায়।
লন্ডন: মোবাইল চুরির হটস্পট
দি গার্ডিয়ান ও শীর্ষস্থানীয় বীমা সংস্থা ‘স্কয়ারট্রেডের’ সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, ইউরোপে মোবাইল ফোন চুরির প্রায় পাঁচ ভাগের দুই ভাগই (৩৯%) ঘটে যুক্তরাজ্যে। এটি একটি অস্বাভাবিক উচ্চ হার, কারণ এই বীমা সংস্থার ইউরোপীয় গ্রাহকদের মাত্র ১০% যুক্তরাজ্যে থাকেন। এই তথ্যে আরও দেখা যায় যে, ২০২১ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে ফোন চুরির অভিযোগ ৪২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দু হলো লন্ডন। মেট্রোপলিটন পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লন্ডনে মোট ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫৫টি মোবাইল ফোন চুরি হয়েছে। এর অর্থ হলো, দিনে গড়ে ৩২০টি এবং প্রতি ঘণ্টায় ১৩টি ফোন চুরি হয়। মাসিক হিসাবে, এই সংখ্যা প্রায় ৯ হাজা ৭২১। ২০১৭ সাল থেকে এই সংখ্যা ৫০%-এর বেশি বেড়েছে এবং পুলিশ এখন এই ঘটনাকে ‘সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কাজ’ হিসেবে বর্ণনা করছে, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি পাউন্ড হতে পারে।
মামলা ও ফোন উদ্ধারের করুণ চিত্র
বিশাল সংখ্যক ফোন চুরির ঘটনা ঘটলেও, লন্ডনে এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হার খুব কম। মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে ১ হাজার ১৬ হাজার ৬৫৫টি ফোন চুরি হলেও মাত্র ১৬৯ জন সন্দেহভাজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বেশিরভাগ চুরির ঘটনায় কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় না।
এছাড়াও, চুরি হওয়া ফোন ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, লন্ডনে চুরি হওয়া ফোনগুলোর মাত্র ২% উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এরপর থেকে এই হার বাড়ার কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। এর কারণ হলো, চুরি হওয়ার পর ফোনগুলো খুব দ্রুত দেশের বাইরে পাচার হয়ে যায়, যা সেগুলো উদ্ধার করা পুলিশের জন্য প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
যদিও যুক্তরাজ্য ফোন চুরির সমস্যার মূল শিকার, এটি সমগ্র ইউরোপের একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপীয় ফোন চুরির ৩৯% যুক্তরাজ্যে ঘটে, যা ইঙ্গিত করে যে অন্যান্য দেশেও এই সমস্যা থাকলেও যুক্তরাজ্য প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ট্রাস্টোনিকের একটি পৃথক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লন্ডনে চুরি হওয়া ডিভাইসের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও মাদ্রিদের মতো কিছু শহরে জনসংখ্যার তুলনায় ফোন চুরির হার বেশি, যা প্রমাণ করে যে এই সমস্যা ব্যাপক এবং শুধু যুক্তরাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় কিছুটা কমে গেলেও সামগ্রিক অপরাধ, বিশেষ করে চুরি, আবারও বাড়তে শুরু করেছে। ইউরোস্ট্যাটের মতে, ২০২৩ সালে আগের বছরের তুলনায় ইইউতে পুলিশে নথিভুক্ত চুরির ঘটনা ৪.৮% বেড়েছে, যা একটি স্পষ্ট ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে। তবে, নির্দিষ্টভাবে পুরো ইউরোপের ফোন চুরির সঠিক ডেটা পাওয়া কঠিন। তবে প্রধান শহরগুলোর পুলিশ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে, তাতে দেখা যায় যে, যুক্তরাজ্যের উচ্চ পরিমাণ চুরি ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে অনেক আলাদা।
ঢাকার অবস্থা কোথায়?
লন্ডনের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার তুলনা করলে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা যায়। লন্ডনের পরিসংখ্যানগুলো সরকারি পুলিশ প্রতিবেদন ও বীমা ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরী করা হয়। সেখানে ঢাকার সংখ্যাগুলো প্রায়শই অনুমান নির্ভর, স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতিবেদন এবং থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) ওপর নির্ভরশীল, কারণ অনেক ভুক্তভোগীই আনুষ্ঠানিক মামলা করেন না।
‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ৫০০টি মোবাইল ফোন চুরি হয় বলে ধারণা করা হয়। এটি একটি রক্ষণশীল অনুমান হলেও, এটি বছরে প্রায় ১ হাজার ৮২ হাজার ৫০০টি চুরির সংখ্যা নির্দেশ করে। এই দৈনিক গড় লন্ডন দৈনিক চুরি হওয়া ৩২০টি ফোনের তুলনায় খুব বেশি নয়। কারণ, লন্ডনের জনসংখ্যা প্রায় এক কোটি, যেখানে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, বেকারত্ব ও জীবনমান বিবেচনা করলে ঢাকার তুলনায় লন্ডনে মোবাইল ফোন বেশি চুরি হয়।
তবে ঢাকায় চুরির পদ্ধতি প্রায়শই সহিংস হয়, যেখানে ভিড়ের মধ্যে ছিনতাই এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। ঢাকায় মোবাইল চুরির কারণ লন্ডনের মতোই—ডিভাইসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং একটি লাভজনক চোরাবাজার। তবে এখানকার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং পুলিশিং ব্যবস্থা ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। মামলা দায়েরের নিম্ন হার এবং উদ্ধার হওয়া ফোনের নগণ্য সংখ্যা অপরাধীদের জন্য এক ধরনের দায়মুক্তির পরিস্থিতি তৈরি করে। সূত্র: দি স্ট্যান্ডার্ড দি গার্ডিয়ান
মাহফুজ/