জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি ঐতিহাসিক ভোটে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নিরসনে ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’ পুনরুজ্জীবনের প্রস্তাব বিপুল সমর্থন পেয়েছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত এই ভোটে ১৪২টি সদস্য রাষ্ট্র প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। মাত্র ১০টি দেশ ভোট দেয় বিপক্ষে। আর ১২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
এই প্রস্তাবকে ‘নিউইয়র্ক ঘোষণাপত্র’ বলা হচ্ছে। ফ্রান্স ও সৌদি আরব যৌথভাবে জাতিসংঘে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে। ঘোষণাপত্রে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের স্থায়ী, ন্যায়সংগত ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ‘বাস্তবসম্মত, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এবং অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ’ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ঘোষণায় বিশেষভাবে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসকে অবশ্যই সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে। হামাসকে অস্ত্র জমা দিয়ে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের হাতে গাজার শাসনভার হস্তান্তর করতে হবে। এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথ প্রশস্ত করা সম্ভব হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবটি জাতিসংঘে পাস হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরব ও ফ্রান্সের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিন বলেছে, এই প্রস্তাব একটি ‘কার্যকর কর্মপরিকল্পনা’ যা ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার আদায় ও ইসরায়েলি দখলদারত্বের অবসানে সহায়ক হবে।
এদিকে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সময়ও ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। এ ছাড়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেন, ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনোই হবে না।’ এর পরের দিনই জাতিসংঘে বিপুল ভোটে এই প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বিরুদ্ধে একপ্রকার প্রতিবাদ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জাতিসংঘে এই প্রস্তাব গ্রহণের পেছনে একটি বড় ভূমিকা রাখে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। এই দুই দেশ চলতি মাসের ২২ তারিখ নিউইয়র্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে, যেখানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং আরও কয়েকজন বিশ্বনেতা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বর্তমানে ১৪৬টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলেও ফ্রান্স, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, স্পেন, যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ শিগগিরই স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টেইন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই ভোট প্রমাণ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাস্তবতা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন এবং প্রস্তাবটি কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’ তিনি অভিযোগ করেন, এই প্রস্তাবে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি, যা পুরো প্রস্তাবকে অসম্পূর্ণ করে তোলে।
ভোটের ঠিক আগের দিন ইসরায়েল পশ্চিম তীরে নতুন বসতি গড়ার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যা দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।
একই সময়ে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মাত্রা বেড়েছে। ইসরায়েল লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া, তিউনিসিয়া এবং কাতারে হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে কাতারে চালানো এক হামলায় পাঁচজন হামাস সদস্য নিহত হয়েছেন, যারা সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন একটি শান্তি উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এই হামলার পর কাতারের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তি আলোচনা বানচাল করতে এই হামলা চালিয়েছে।’ তিনি এটিকে ‘ঔদ্ধত্যপূর্ণ’ আচরণ হিসেবে অভিহিত করেন।
গতকাল ভোটের দিন গাজায় ইসরায়েলের বোমা হামলায় নিহতের সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ৫৯ জন। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা গত সপ্তাহে গাজা শহরে পাঁচটি বড় ধরনের বিমানহামলা চালিয়ে ৫০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে এবং এই অভিযান চলবে।
জাতিসংঘে এই ভোটের মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা আর শান্তিপূর্ণ সমাধানকে শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক জটিল, তবে এটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা