বেলারুশের রাজধানী মিনস্ক থেকে ৪৫ মাইল (৭২ কিমি) দূরে একটি বিশাল মাঠে তুমুল যুদ্ধ চলছে। সুখোই-৩৪ বোমারু বিমান গাইডেড বোমা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বিশাল বিস্ফোরণ হচ্ছে। ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী আকাশকে অন্ধকার করে দিচ্ছে।
পুরো এলাকা মর্টারের গোলা ও কামানের শেল বিস্ফোরণের শব্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হেলিকপ্টার গানশিপগুলোও আক্রমণে যোগ দিয়েছে, আর নজরদারি ড্রোনগুলো ওপর থেকে ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করছে।
তবে এটি কোনো যুদ্ধ নয়, শুধু একটি মহড়া।
এটি ‘জাপাদ-২০২৫’ (পশ্চিম-২০২৫) সামরিক মহড়ার অংশ। বিভিন্ন দূতাবাসের সামরিক অ্যাটাচেরাও একটি পর্যবেক্ষণ মঞ্চ থেকে এই মহড়া দেখছেন।
তবে সম্প্রতি পোল্যান্ড সীমান্তে ন্যাটোর ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন, সঙ্গে ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশের অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও সমরাস্ত্র মোতায়েনের বিপরতে একটি প্রচ্ছন্ন পদক্ষেপ হিসেবে এই মহড়াকে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
এগুলো পূর্বপরিকল্পিত মহড়া যা প্রতি চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়। ২০২২ সালে দুই লাখ সেনা এতে অংশ নিয়েছিল, তবে এই বছরের মহড়ায় তুলনামূলকভাবে কম সেনা যুক্ত হয়েছে। কারণ, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অধিকাংশ লোকবল ফ্রন্টলাইনে নিয়োজিত।
মস্কো ও মিনস্কের দাবি, এই মহড়া সম্পূর্ণভাবে প্রতিরক্ষামূলক এবং রাশিয়া ও বেলারুশের নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি যেকোনো সম্ভাব্য বাহ্যিক হুমকি মোকাবিলায় এর আয়োজন করা হয়েছে।
এবার বেলারুশ জোর দিয়ে বলছে যে তাদের লুকানোর কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং হাঙ্গেরি সহ ২৩টি দেশের প্রতিনিধিরা এই সামরিক মহড়া দেখেছেন।
বেলারুশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সহকারী মেজর জেনারেল ভ্যালেরি রেভেনকো প্রশিক্ষণ মাঠে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আমরা মনে করি এই মহড়া স্বচ্ছতার দিক থেকে নজিরবিহীন।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমরা কাউকে হুমকি দিচ্ছি না। আমরা গঠনমূলক এবং বাস্তবসম্মত আলোচনার পক্ষে।’’
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক যে এতে সন্তুষ্ট নন, তা স্পষ্ট। তিনি এই মহড়াকে ‘‘খুবই আক্রমণাত্মক’’ বলে অভিহিত করেছেন। মহড়ার আগে পোল্যান্ড বেলারুশের সঙ্গে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, যা মিনস্কের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
এই মহড়া এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে। দক্ষিণে, রাশিয়া ইউক্রেনে তার যুদ্ধ শেষ করার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে পোল্যান্ড অভিযোগ করে যে একটি রুশ ড্রোন তাদের আকাশসীমা ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করেছে। ন্যাটো এর জবাবে কিছু ড্রোনকে ভূপাতিত করার জন্য যুদ্ধবিমান পাঠায়।
মস্কো এর উত্তরে দাবি করে যে তারা পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে লক্ষ্যবস্তু আঘাত করার পরিকল্পনা করেনি।
গতকাল রোমানিয়াও জানায় যে একটি রুশ ড্রোন তাদের আকাশসীমাও লঙ্ঘন করেছে। ইউরোপে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে যে এই ধরনের ড্রোন অনুপ্রবেশ কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি রুশ কৌশল, যার মাধ্যমে তারা ইউরোপীয় নেতাদের এবং ন্যাটো জোটের ঐক্য ও সংকল্প পরীক্ষা করতে চাইছে।
সম্প্রতি রাশিয়া এবং বেলারুশ উভয়ই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে মস্কো ও মিনস্ক উভয়ের ক্ষেত্রেই ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এখনও টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে।
বোরিসোভস্কি প্রশিক্ষণ মাঠে বিস্ফোরণ এবং গোলাগুলির মধ্যেও সম্ভবত পশ্চিমের জন্য একটি বার্তা রয়েছে। আর এটি সবার আগে ইউরোপের জন্য। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/