সম্প্রতি কাশ্মীরে সক্রিয় পাকিস্তানের জিহাদি জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদের (জেইএম) শীর্ষ কমান্ডার মাসুদ ইলিয়াস কাশ্মীরির একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ার পর নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
এক ভিডিওতে এই কমান্ডার দাবি করেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনির ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুরে’- নিহত ব্যক্তিদের জানাজায় কয়েকজন শীর্ষর জেনারেলদের পাঠিয়েছিলেন।
অথচ দশকের পর দশক ধরে ইসলামাবাদ তাদের মাটি থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইলিয়াস কাশ্মীরি মিশন মুস্তাফার ৩৮তম বার্ষিক সম্মেলনে প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতীয় অভিযানে নিহত জঙ্গিদের জানাজায় উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের পাঠান।
গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি একটি ছবি প্রকাশ করেন। যেখানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষিত আবদুর রউফ নিহত ব্যক্তিদের এক জানাজায় ইমামতি করছেন। নিহত ব্যক্তিদের পাকিস্তানের জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে, ওইসব স্থাপনায় যে ব্যক্তিরা নিহত হয়েছে, তারা সন্ত্রাসী। পাকিস্তানে হয়তো সন্ত্রাসীদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা দেওয়ার রেওয়াজ থাকতে পারে। আমাদের কাছে এর কোনো অর্থ দাঁড়ায় না।’
পাক সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনির নিজেও ভারতে পরমাণু হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার মুখে পড়েন।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া এক ভাষণে তিনি ভারতকে সতর্ক করে বলেন, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তারা একা ধ্বংস হবেন না।
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমরা পরমাণু শক্তিধর দেশ। যদি মনে করি, আমরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি, তাহলে পৃথিবীর অর্ধেককে সঙ্গে নিয়েই ধ্বংস হব।’
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন তার এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, পাকিস্তান ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রের’ মতো আচরণ করছে। তিনি মুনিরের বক্তব্যের ধরনকে ‘ওসামা বিন লাদেন ও আইএসের’ সঙ্গে তুলনা করেন।
রুবিন মন্তব্য করেন, আমেরিকানরা সন্ত্রাসবাদকে সাধারণত অভিযোগ-অভিমান বা ক্ষোভের দৃষ্টিতে দেখেন... তারা সন্ত্রাসীদের আদর্শগত ভিত্তি বোঝেন না। আসিম মুনির হলেন স্যুট পরা ওসামা বিন লাদেন।
চলতি বছরের ১৮ জুন হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন মুনির, যা ভারতের অপারেশন সিঁদুর শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরের ঘটনা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডপ্রধান জেনারেল মাইকেল কুরিল্লা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ‘চমৎকার সহযোগী’ হিসেবেও প্রশংসা করেন।
যদিও ২০২২ সালে পাকিস্তানকে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) ধূসর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভারত আবারও তাদের তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে, ভারত দাবি করছে, ২০২২ সালে যখন পাকিস্তানকে তালিকা থেকে সরানো হয়েছিল, তখন শর্ত ছিল, তারা সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করবে। কিন্তু এখনো সে আইন হয়নি। ফলে এফএটিএফের নিজেরই পাকিস্তানকে আবার তালিকাভুক্ত করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
প্রসঙ্গত , জইশ-ই-মোহাম্মদ ( জেইএম ) হল একটি দেওবন্দি ইসলামপন্থী জিহাদি পাকিস্তানি জঙ্গি গোষ্ঠী। এটি কাশ্মীরে সক্রিয়। এই গোষ্ঠীর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারত থেকে আলাদা করে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করা।
২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে, এই গোষ্ঠীটি ভারতে বেসামরিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে।
এটি তালেবান, আল-কায়েদা, লস্কর-ই-তৈয়বা, হিজবুল মুজাহিদিন, হরকাত-উল-মুজাহিদিন, আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং জোট বজায় রাখেন।
অভিযোগ রয়েছে , পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এর সহায়তায় জেইএম তৈরি হয়েছিল। পাকিস্তানের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অব্যাহত আন্তর্জাতিক চাপের কারণে, আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে ২০০২ সালে পাকিস্তানে জেইএম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
তবে, সংগঠনটি কখনও ভেঙে ফেলা হয়নি বা এটির গ্রেপ্তার নেতাদের পরবর্তীতে কোনও অভিযোগ ছাড়াই মুক্তি দেওয়া হয়।
সুলতানা দিনা/