সামরিক শক্তি সবসময় একটি দেশের ক্ষমতার একটি বড় মাপকাঠি। অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কূটনীতি একটি দেশের ভূমিকা গঠন করলেও, নিজের সীমানা রক্ষা করা এবং বিদেশে শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষমতা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশাল সৈন্যবাহিনী, প্রতিরক্ষা বাজেট, উন্নত প্রযুক্তি, পারমাণবিক অস্ত্র এবং স্থল, আকাশ, সমুদ্র এবং এমনকি মহাকাশে কাজ করার ক্ষমতাসহ প্রযুক্তির এই যুগে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীর জন্য অনেক কিছু প্রয়োজন।
২০২৫ সালে সৈন্যসংখ্যা, আধুনিক অস্ত্র, শক্তিশালী বাজেট এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রভাব ফেলার এবং ক্ষমতার নিরীখে বিশ্বের ১০টি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী-
১. যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর শীর্ষে রয়েছে। তাদের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার এবং সৈন্যসংখ্যা ২১ লাখের বেশি। তাদের শক্তি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে। তাদের আছে ১১টি পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী, সবচেয়ে বড় গোপন যুদ্ধবিমানের বহর এবং বিশ্বজুড়ে ৭৫০টির বেশি সামরিক ঘাঁটি। এ ছাড়া, তারা ড্রোন যুদ্ধ, সাইবার ক্ষমতা এবং মহাকাশে অপারেশনেও এগিয়ে রয়েছে। এসব তাদের বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী
২. রাশিয়া
রাশিয়ার আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এবং প্রায় ৩৫ লাখ সৈন্য। তাদের বার্ষিক প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় ১২৬ বিলিয়ন ডলার। তাদের ট্যাঙ্ক এবং কামানের সংখ্যা অতুলনীয় এবং তাদের সেনাবাহিনীর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অনেক। যদিও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তাদের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, তবুও তারা হাইপারসনিক অস্ত্র এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ করছে। এটি তাদের ইউরোপ এবং তার বাইরে একটি শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে রেখেছে।
রাশিয়ান সেনাবাহিনী
৩. চীন
চীন তাদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকভাবে রূপান্তর করেছে। তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ২৬৭ বিলিয়ন ডলার এবং সৈন্যসংখ্যা ৩১ লাখের বেশি। তাদের আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনী (জাহাজের সংখ্যার দিক থেকে) এবং জে-২০ গোপন যুদ্ধবিমান এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা। চীন সাইবার যুদ্ধ, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের সামরিক আধুনিকীকরণ বিশ্বের দ্রুততমগতির একটি। তাদের লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা।
চীনা সেনাবাহিনী
৪. ভারত
ভারতের সামরিক বাহিনীতে ৫১ লাখের বেশি সৈন্য রয়েছে এবং তাদের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার। তাদের আছে পারমাণবিক অস্ত্র এবং কার্যকর ডেলিভারি সিস্টেম। ভারতীয় মহাসাগরে তাদের নৌবহর ক্রমশ বাড়ছে। তারা তেজাস যুদ্ধবিমান এবং অরিহন্ত-শ্রেণির সাবমেরিনের মতো স্থানীয় প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। এছাড়াও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির প্রকল্প হাতে নিয়েছে দেশটি। যদিও আধুনিকীকরণে কিছু ঘাটতি রয়েছে, তবুও ভারত এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে একটি বড় শক্তি।
ভারতীয় সেনাবাহিনী
৫. দক্ষিণ কোরিয়া
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং সৈন্যসংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ। উত্তর কোরিয়ার হুমকির মধ্যে থাকায় তারা উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং উন্নত সাঁজোয়া যান তৈরি করেছে। তাদের শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তাদের এশিয়ার সবচেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামরিক বাহিনীগুলোর একটি করে তুলেছে।
কোরিয়ান সেনাবাহিনী
৬. যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের সৈন্যসংখ্যা প্রায় ১১ লাখ (রিজার্ভ সহ) এবং প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলার। তাদের সামরিক বাহিনী অত্যন্ত আধুনিক। তাদের আছে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন, দুটি বিমানবাহী রণতরী এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, সাইবার যুদ্ধ ক্ষমতা এবং বিদেশে অপারেশন চালানোর ক্ষমতা তাদের বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে রেখেছে।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনী
৭. ফ্রান্স
ফ্রান্সের সৈন্যসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার এবং প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার। তারা পারমাণবিক অস্ত্রের সম্পূর্ণ সক্ষমতা (ট্রায়াড) সম্পন্ন কয়েকটি দেশের একটি। তাদের আছে রাফাল যুদ্ধবিমান এবং পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী শার্ল দ্য গল। ফ্রান্সের বিদেশি অঞ্চলগুলো তাদের বিশ্বব্যাপী প্রভাব দেয়। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দেয় এবং সাইবার ও মহাকাশ যুদ্ধে বিনিয়োগ করে।
ফরাসি সেনাবাহিনী
৮. জাপান
জাপানের সৈন্যসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ২৮ হাজার এবং প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলার। তাদের সংবিধান শুধু আত্মরক্ষার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তবুও তাদের আছে অত্যন্ত উন্নত সামরিক প্রযুক্তি। এজিস ডেস্ট্রয়ার, উন্নত সাবমেরিন এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান তাদের শক্তির মূল অংশ। আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে জাপান তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে এবং আরও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করছে।
জাপানি সেনাবাহিনী
৯. তুরস্ক
তুরস্কের সৈন্যসংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৩ হাজার এবং প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার। তাদের শক্তি তাদের ক্রমবর্ধমান দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে, বিশেষ করে বায়রাক্তার টিবি২ ড্রোনের মতো বিশ্বখ্যাত অস্ত্রে। ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাঝখানে অবস্থানের কারণে তুরস্ক আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করছে এবং ন্যাটোর সক্রিয় সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তুর্কি সেনাবাহিনী
১০. ইতালি
ইতালির সৈন্যসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার এবং প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার। তাদের আছে দুটি বিমানবাহী রণতরী, আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং শক্তিশালী নৌবহর। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ইতালি ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগরীয় নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের সুষম ও বহুমুখী বাহিনী আন্তর্জাতিক মিশনে অংশ নিতে এবং নিজেদের অঞ্চল সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম।
ইতালিয়ান সেনাবাহিনী
সুমন/