রাশিয়ার শীর্ষ দুটি তেল কোম্পানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ওপর চাপ বাড়াতে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গতকাল বুধবার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৬৫ দশমিক ৬৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ। নতুন এই পদক্ষেপে রাশিয়ার দুই বৃহত্তম তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রসনেফট (Rosneft) ও লুকওয়েল (Lukoil)কে লক্ষ্য করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা দুই কোম্পানির সব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং মার্কিন কোম্পানি ও নাগরিকদের তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া রসনেফট ও লুকওয়েলের সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপরও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। এতে চীন, ভারত ও তুরস্কের সেইসব ব্যাংকও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যারা রুশ তেল বিক্রির অর্থ লেনদেন পরিচালনা করে।
এই চাপ ইতোমধ্যে প্রভাব ফেলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলো রুশ তেল আমদানি ব্যাপকভাবে কমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ রুশ তেল কেনা কমানো বা পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত ছাড়কৃত দামে রুশ তেল আমদানিকারকদের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে পরিচিত। এ কারণে গত আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের অধিকাংশ রপ্তানি পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে, যার উদ্দেশ্য ছিল নয়াদিল্লির ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। জ্বালানি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি শেল ও বিপির (BP) শেয়ার বৃহস্পতিবার সকালে প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচকে সর্বোচ্চ লাভজনক শেয়ারের মধ্যে ছিল।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের এটি প্রথম নিষেধাজ্ঞা, যা তিনি হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে আসার পর জারি করলেন। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি একে “অসাধারণ” পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “এগুলো রাশিয়ার দুই বৃহত্তম তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে বড় নিষেধাজ্ঞা, তবে আমরা আশা করি এগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আমরা চাই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক।”
ট্রাম্প আরও বলেন, “আমরা আশা করি পুতিন আলোচনায় যুক্ত হবেন, এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও যুক্তিসংগত অবস্থান নেবেন। শেষ পর্যন্ত, আলোচনায় দুই পক্ষের সহযোগিতা জরুরি।”
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও রুশ জ্বালানি খাতে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে রুশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) আমদানি নিষিদ্ধ করাও অন্তর্ভুক্ত।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, “প্রয়োজনে আমরা আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা সফল হয়। আমরা আমাদের মিত্রদেরও আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন এই নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেয় ও তা মেনে চলে।”
ব্রিটেন গত সপ্তাহেই রসনেফট ও লুকওয়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রসনেফটের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লুকওয়েলকে এখনো ছাড় দেওয়া হয়েছে—মূলত হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার জন্য, যারা রুশ তেলের ওপর নির্ভরশীল।
ট্রাম্প বুধবার আরও জানান, তিনি পুতিনের সঙ্গে পরিকল্পিত বৈঠক বাতিল করেছেন। প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমার মনে হয়নি এই মুহূর্তে বৈঠকটি ফলপ্রসূ হবে, তাই বাতিল করেছি। তবে ভবিষ্যতে আমরা আবার বসব।”
ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের পর এবারই বিশ্ববাজারে তেলের দামের সবচেয়ে বড় উত্থান ঘটেছে। সূত্র: দি গার্ডিয়ান
মাহফুজ/