যুক্তরাষ্ট্র সরকার অর্থায়ন বন্ধ করায় রেডিও ফ্রি এশিয়া (আরএফএ) কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়ছে। আরএফএ জানায়, তারা আগামী শুক্রবার থেকে সব ধরনের সংবাদ প্রচার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। ১৯৯৬ সালে সম্প্রচার শুরু হওয়ার পর এধরনের ঘটনা এটাই প্রথম।
বুধবার (৩০ অক্টোবর) এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
উল্লেখ্য প্রায় তিন দশক আগে চীনসহ স্বাধীন গণমাধ্যমবিহীন এশীয় দেশগুলোর খবর প্রচারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রেডিও ফ্রি এশিয়া (আরএফএ)।
সংস্থাটি এরই মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি কর্মকর্তাকে-কর্মচারীকে ছাঁটাই বা অস্থায়ী ছুটিতে পাঠিয়েছে। সংবাদ প্রচার কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে কমিয়ে এনেছে।
গত মার্চে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত গণমাধ্যমগুলোর বরাদ্দ বড় পরিমাণে কাটছাটের পরই এই সংকট দেখা দেয়।
দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিংয়ের গলার কাটা ছিল এই আরএফএ। এশিয়া সফররত ট্রাম্প যখন সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে ঠিক তখনই সংবাদমাধ্যমটি বন্ধের খবর এল।
ট্রাম্পের বাজেট বরাদ্দের কিছু কাটছাট আদালতের মাধ্যমে ঠেকানো গেলেও, প্রায় এক মাস ধরে চলা মার্কিন সরকারের শাটডাইনে রেডিও ফ্রি এশিয়ার অর্থপ্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
আরএফএ-এর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বে ফাং বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের মানে হল, অবশিষ্ট অর্থ এখন ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের ছুটি বা ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যবহার করা যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের কৌশল ছিল যতদিন সম্ভব কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া।’
বে ফাং জানান, রেডিও ফ্রি এশিয়া নতুন করে অর্থায়ন পেলে আবার সম্প্রচার শুরু করতে পারবে।
তিনি বলেন, ‘পুনরায় সম্প্রচার শুরু করতে আমাদের যা যা প্রয়োজন সব কিছু সংরক্ষণের চেষ্টা করছি। আমার মনে হয়, এটা সময়ের সঙ্গে লড়াই। আমাদের যত দ্রুত সম্ভব এই অর্থায়ন যোগাড় করতে হবে।’
‘কোল্ড ওয়ার’-এর সময় সোভিয়েত ব্লকের ভেতরে সংবাদ প্রচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় রেডিও ফ্রি ইউরোপ বা রেডিও লিবার্টি। এটি এখনও ইউরোপীয় কিছু দেশ বিশেষ করে চেক প্রজাতন্ত্রের সহায়তায় আংশিকভাবে টিকে আছে।
এই সংবাদমাধ্যমটি আরএফএ প্রতিষ্ঠার সময় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরাসরি অংশ ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ (ভিওএ) ট্রাম্পের বরাদ্দ কমানোর পরপরই বন্ধ হয়ে যায়। তাদের ইংরেজি ওয়েবসাইটে এখনও মার্চ মাসের খবর চোখে পড়বে।
চীনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ প্রচার করছে রেডিও ফ্রি এশিয়া। যদিও বেইজিং তাদেরকে ‘ভুয়া খবর’ ছড়ানোর অভিযোগে বরাবার দোষারোপ করে আসছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘গ্লোবাল টাইমস’-এর সাবেক সম্পাদক হু শিজিন মার্চে আরএফএর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়াকে ‘অত্যন্ত সন্তোষজনক’ বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্প বরাবরই গণমাধ্যমের সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার কেন এমন খবর প্রচারের জন্য অর্থ দেবে, যা তার পক্ষে অনুকূল নাও হতে পারে।
চীনা, তিব্বতি ও অন্যান্য এশীয় ভাষায় সংবাদ প্রচারকারী এই সম্প্রচার মাধ্যম বন্ধ করা ‘সি জিনপিংয়ের মতো স্বৈরশাসকদের জন্য এক উপহার’ বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার সংগঠন ‘নেটওয়ার্ক অব চাইনিজ হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স’-এর সহ-নির্বাহী পরিচালক সোফি রিচার্ডসন।
তিনি বলেন, ‘চীন বর্তমানে তথ্য নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সক্রিয়। কোনো খবর দেশের মধ্যে বলা যাবে এবং কোনটা বলা যাবে না সেটি তারা গবীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
রিচার্ডসন চীনের মানবাধিকার বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, ‘যেসব বেসরকারি সংস্থা চীনের ঘটনা নথিভুক্ত করত, ট্রাম্প সরকার তাদের অর্থায়নও বন্ধ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘খুব শিগগিরই আমরা দেখতে পাব কিছু বিষয় নিয়ে লেখা বা গবেষণা করা কঠিন হয়ে যাবে, কারণ আমরা সেগুলোর সত্যতা যাচাই বা প্রবণতা বিশ্লেষণের সুযোগ পাব না।’
সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকোলাস বার্নস এক্স-এ লিখেছেন, আরএফএ বন্ধ করা ‘একটি বড় ভুল’, যা ‘চীনা জনগণকে সত্য জানানো এবং বেইজিংয়ের প্রচারণার পাল্টা জবাব দেওয়ার পথ বন্ধ করবে।’
আরএফএ জানায়, চীন এরই মধ্যে তাদের পরিত্যক্ত ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার শুরু করেছে এবং উইঘুর ও তিব্বতি ভাষায় সম্প্রচার বাড়িয়েছে।
আরএফএ ছিল উইঘুর ভাষার এমন একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম যেটিতে বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সংস্থাটি প্রথম থেকেই চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উইঘুর জনগোষ্ঠীর জন্য তৈরি বড় বন্দি শিবির সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি রেডিও ফ্রি এশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ সম্প্রচার পুরস্কার ‘এডওয়ার্ড আর মুরো অ্যাওয়ার্ডস’-এর দুটি বিভাগে পুরস্কার পায়। এর মধ্যে একটি ছিল ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের তরুণদের জীবনের ওপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রচারের জন্য।
সুমন/