নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইসলামিক স্টেট (আইএস)–সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে জঙ্গিরা নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জানায়, নাইজারের সীমান্তবর্তী সোকোতো রাজ্যে আইএস পরিচালিত কয়েকটি ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়েছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে ‘একাধিক’ জঙ্গি নিহত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বড়দিনের দিন চালানো এসব হামলা ছিল শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী। তিনি আইএসকে ‘সন্ত্রাসী আবর্জনা’ বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, তারা প্রধানত নিরীহ খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে নির্মমভাবে হত্যা করছিল।
তবে নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ মাইতামা তুগার বিবিসিকে বলেন, এটি ছিল একটি যৌথ অভিযান এবং এর সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সম্পর্ক নেই।
তুগার জানান, এই হামলার পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরেই করা হচ্ছিল এবং এতে নাইজেরিয়ার দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হামলার সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। হামলার সময় নিয়ে তিনি বলেন, এর সঙ্গে বড়দিনের কোনো সম্পর্ক নেই—অন্য যেকোনো দিনও হতে পারত। বিষয়টি হলো সন্ত্রাসীদের ওপর আঘাত হানা, যারা নাইজেরিয়ানদের হত্যা করছে।
নাইজেরিয়া বহু বছর ধরে বোকো হারাম ও আইএস–সংশ্লিষ্ট বিভক্ত গোষ্ঠীগুলোর মতো জটিল জিহাদি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে জঙ্গিদের বিস্তার তুলনামূলকভাবে নতুন।
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে নাইজেরীয় সরকারকে জিহাদি হামলা থেকে খ্রিস্টানদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ করেছিল এবং সেখানে ‘গণহত্যা’ চলছে বলেও দাবি করেছিল। ট্রাম্প নাইজেরিয়াকে ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন—মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এমন একটি তালিকা, যার আওতায় ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘনে জড়িত দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা রয়েছে। নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে নাইজেরিয়ায় হস্তক্ষেপের প্রস্তুতি নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সে সময় নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবুর এক উপদেষ্টা বলেছিলেন, জঙ্গিরা সব ধর্মের মানুষকেই লক্ষ্য করেছে এবং যেকোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ যৌথভাবে হওয়া উচিত।
সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থা বলছে, নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টানরা মুসলমানদের তুলনায় বেশি হত্যার শিকার হচ্ছেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই। দেশটিতে মুসলমান ও খ্রিস্টান অনুসারীর সংখ্যা প্রায় সমান।
বড়দিনের রাতে সামাজিক মাধ্যমে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ট্রাম্প লেখেন, তিনি চরমপন্থী ইসলামি সন্ত্রাসবাদকে বিকশিত হতে দেবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার বলেন, নাইজেরীয় সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞ তিনি। এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি ‘‘মেরি ক্রিসমাস!’’ লিখে পোস্ট করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে একটি জাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা যায়।
শুক্রবার সকালে নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দেশটির কর্তৃপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে গঠিত নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত রয়েছে, যাতে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থার স্থায়ী হুমকি মোকাবিলা করা যায়। বিবৃতিতে বলা হয়, এর ফলেই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আকাশপথে সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত সম্ভব হয়েছে।
বোকো হারাম ও আইএস–সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তাণ্ডব চালিয়ে আসছে; এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতা বিশ্লেষণকারী সংস্থা এসিএলইডির (ACLED) তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের বেশির ভাগই মুসলমান।
নাইজেরীয় মানবাধিকার আইনজীবী ও সংঘাত বিশ্লেষক বুলামা বুকাতি ধারণা করছেন, বৃহস্পতিবারের হামলায় আইএস–সমর্থিত একটি তুলনামূলক নতুন বিভক্ত গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নাইজেরিয়ায় আইএস–সংশ্লিষ্ট সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী (ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স) দেশটির উত্তর-পূর্বে সক্রিয়। আর ছোট গোষ্ঠীটি, স্থানীয়ভাবে ‘লাকুরাওয়া’ নামে পরিচিত, উত্তর-পশ্চিমের সোকোতো রাজ্যে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, ২০১৮ সাল থেকে তারা ধীরে ধীরে নাইজেরিয়ায় ঢুকতে শুরু করে। তবে গত ১৮ মাস বা দুই বছরে তারা সোকোতো ও কেব্বি রাজ্যে ক্যাম্প স্থাপন করেছে। গত দেড় বছরে তারা সোকোতোতে হামলা চালাচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষের ওপর নিজেদের সামাজিক আইন চাপিয়ে দিচ্ছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি’র মনিটরিংয়ের তথ্যে দেখা গেছে, আইএস সমর্থিত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেলে প্রায় প্রতিদিনই সোকোতোতে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি উড়োজাহাজের উড্ডয়নের খবর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্বের বর্নো রাজ্যেও এমন উড়োজাহাজ দেখা যাচ্ছে, যেখানে নাইজেরিয়ার সবচেয়ে বড় আইএস সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি রয়েছে।
নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলেও পানি ও চারণভূমি নিয়ে প্রধানত মুসলিম পশুপালক ও অনেক ক্ষেত্রে খ্রিস্টান কৃষকদের মধ্যে ঘন ঘন সংঘর্ষ হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার এই সহিংস চক্রে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, উভয় পক্ষ থেকেই নৃশংসতা ঘটেছে।
নাইজেরিয়ায় এই হামলা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আইএস লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বড় সামরিক অভিযান। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, যুদ্ধবিমান, আক্রমণ হেলিকপ্টার ও কামান ব্যবহার করে মধ্য সিরিয়ার বিভিন্ন স্থানে ৭০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। জর্ডানের বিমানও এতে অংশ নেয়।
এই হামলাগুলো চালানো হয় আইএসের এক হামলায় তিনজন মার্কিন নাগরিক (দুই সেনা ও এক বেসামরিক দোভাষী) নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/