ভারতে বড়দিন উদযাপনকে ঘিরে খ্রিষ্টান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার পেছনে ভূমিকা রেখেছে দেশটির হিন্দুত্ববাদী উগ্র ডানপন্থি সংগঠনগুলো। অন্যদিকে এক ধরনের নীরব ভূমিকা পালন করছে দেশটির ক্ষমতাসীন সরকার।
এসব হামলার অভিযোগ সামনে আসার পর এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে দেশটির খ্রিষ্টান ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অধ্যুষিত দেশে খ্রিষ্টানদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলা যেভাবে ‘উদ্বেগজনক’ হারে বেড়েছে, সেটি ‘দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা’ জানায় তারা।
সংগঠনটি বলেছে, ক্যারল গান গাওয়া দল, উপাসনালয় ও গির্জায় সমবেত প্রার্থনাকারীদের হয়রানির সঙ্গে জড়িত একাধিক ঘটনার তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে।
খ্রিষ্টান অধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা ওপেন ডোরস জানিয়েছে, বড়দিনের সময় ভারতে খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে ৬০টিরও বেশি কথিত হামলার ঘটনা তারা রেকর্ড করেছে। মধ্য ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের জবলপুর থেকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি দলের স্থানীয় নেত্রী হিসেবে পরিচিত অঞ্জু ভার্গব এক বড়দিনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক খ্রিষ্টান নারীকে হয়রানি ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছেন। ভিডিওটি ঘিরে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিরোধী কংগ্রেস দল এটিকে ‘নিষ্ঠুরতা ও সংবেদনশীলতার অভাবের’ উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দেয়।
এর জেরে বিজেপি জবলপুর শাখা অঞ্জু ভার্গবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠায়। দলের স্থানীয় সভাপতি রাকেশ সোনকর বলেন, ভিডিওতে দেখা তার আচরণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে তাকে বলা হয়েছে এবং জবাব দেওয়ার জন্য সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
অঞ্জু ভার্গব অবশ্য কোনো অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় কিছু ‘অ্যাক্টিভিস্ট’-এর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের দাবি ছিল, গির্জার কাছে একটি জরাজীর্ণ ভবনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের জোরপূর্বক আটকে রাখা হয়েছে।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়নি। পূর্ব ভারতের ওড়িশা রাজ্য থেকে পাওয়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একদল হিন্দু পুরুষ রাস্তার পাশে সান্তা টুপি বিক্রি করা দোকানিদের হয়রানি করছে। তারা একটি ‘হিন্দু দেশে’ ‘খ্রিষ্টান সামগ্রী’ বিক্রির বিরোধিতা করে।
ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘হিন্দু হয়ে তোমরা এটা কীভাবে করতে পারো?’ আরও বলা হয়, ‘তাড়াতাড়ি গুটিয়ে এখান থেকে চলে যাও। কিছু বিক্রি করতে হলে ভগবান জগন্নাথের জিনিস বিক্রি করো।’
ভারতের রাজধানী দিল্লির লাজপত নগর এলাকায় ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, হিন্দু উগ্রপন্থি সংগঠন বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা একদল ব্যক্তি সান্তা টুপি পরা নারীদের হয়রানি করছে। তারা অভিযোগ করেন, ওই নারীরা খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরের উদ্দেশ্যে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ওপেন ডোরস বলেছে, ‘এই উদ্বেগজনক ঘটনাগুলো, শান্তিপূর্ণ বড়দিন উদযাপন করতে গিয়ে বহু খ্রিষ্টানের মনে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের অনুভূতিকে আরও জোরালো করেছে।’ সংস্থাটি জানায়, এসব ঘটনার মধ্যে হরিয়ানায় বড়দিনের একটি অনুষ্ঠান ব্যাহত করার ঘটনাও রয়েছে। সেখানে উগ্র হিন্দু গোষ্ঠীগুলো দাবি করেছিল, অনুষ্ঠানটি খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরের ফাঁদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স জানিয়েছে, তারা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে বড়দিন শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন করা যায়।
সংগঠনটি বলেছে, ‘বড়দিনের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার যে উদ্বেগজনক বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, আমরা তার নিন্দা জানাই।’ তারা অঞ্জু ভার্গবের কথিত আচরণে ‘বিশেষভাবে হতবাক’ হওয়ার কথা জানিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
সংগঠনটি আরও বলেছে, ‘শান্তিপূর্ণ ক্যারল গায়ক ও গির্জায় প্রার্থনার জন্য জড়ো হওয়া বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে এসব লক্ষ্যভিত্তিক ঘটনা সংবিধানে নিশ্চিত ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ভয়মুক্তভাবে বেঁচে থাকা ও উপাসনার অধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত।’
ইউনাইটেড ক্রিশ্চিয়ান ফোরাম জানিয়েছে, চলতি বছরে ভারতে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ৬০০টিরও বেশি কথিত হামলার ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে জনতার হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর এবং প্রার্থনা ব্যাহত করার ঘটনাও রয়েছে।
এদিকে, হিন্দুত্ববাদী উগ্র ডানপন্থি পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ হিন্দুদের বড়দিনের অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সুরেন্দ্র গুপ্ত গত মাসে লেখা এক চিঠিতে বলেন, অন্য ধর্মের উৎসবে অংশগ্রহণ করলে ‘অন্য বিশ্বাসের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে’। তিনি আরও বলেন, এই নির্দেশনার উদ্দেশ্য হিন্দুদের ‘সাংস্কৃতিকভাবে জাগ্রত’ করা।
ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। হিন্দু ও ইসলামের পর খ্রিষ্টধর্ম দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম। খ্রিষ্টান সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিন্দু উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছে। তবে বিজেপি অতীতে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সূত্র: ইনডিপেনডেন্ট