আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার আশঙ্কা নতুন করে ঘনীভূত হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর গত ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকের আশঙ্কা, বাংলাদেশ আবারও সেই সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে যাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার কাতারভিত্তিক সংবাদসংস্থা আল-জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
বিএনপির এক নেতা কাজী শাওন আলম আল-জাজিরাকে বলেন, গত ৭ জানুয়ারি সহকর্মী নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তার মতে, এই হত্যাকাণ্ড স্পষ্ট করে দিয়েছে, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রচার এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে তিনি ও মুসাব্বির একসঙ্গে চারবার কারাবরণ করেছিলেন। সরকার ওই সময় বিরোধী দল দমনে গণগ্রেপ্তার, হত্যা ও গুমের ঘটনা ঘটিয়েছিল।
ঢাকা-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর অলটারনেটিভস পরিচালিত বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে দেশে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৪৯ জন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২১ জন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৪২ জন নিহত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ও জামায়াত বর্জন করেছিল। ওই নির্বাচনের দিনই অন্তত ২১ জন নিহত হন এবং প্রায় ৪০০টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচন শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত হয়। মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচনগুলোকে এক তরফা বলে উল্লেখ করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে মাত্র চার দিনের মধ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা ৪৭টি সহিংস ঘটনার নথি প্রকাশ করে। এসব ঘটনায় আটজন নিহত হন এবং ৫৬০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সহিংস অতীতই ব্যাখ্যা করে কেন শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার পর অনুষ্ঠিত প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন নিয়েও মানুষের ভয় কাটছে না।
কিছু এলাকায় সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে। টাঙ্গাইল জেলায় ছাত্রদল নেতা তুষার খান জানান, তিনি এক সিনিয়র বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছেন। তার অভিযোগ, ওই নেতা তাকে হুমকি দিয়েছেন এবং বলেছেন, প্রচারে সক্রিয় থাকলে তার হাত-পা ভেঙে দেওয়া হবে। এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে একটি আসনের মনোনয়ন। সেখানে সাবেক মন্ত্রী বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যিনি দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ছেন। তুষার খানের দাবি, ভোটের দিন প্রতিপক্ষের কর্মীদের ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে রাখতেই এই ভয় দেখানো হচ্ছে। অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তুষার তাদের প্রার্থীকে অপমান করেছেন এবং যারা উসকানি দেবে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।
গণমাধ্যমের তথ্যমতে, বিএনপির ৯২ জন নেতা বর্তমানে ৭৯টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে রয়েছেন। জামায়াতের রয়েছে একজন। বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি থাকা আসনগুলোতে সহিংসতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। শনিবার একদিনেই চারটি জেলায় বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।
নির্বাচনি উত্তেজনা এখন প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। গত ২০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকার মিরপুর এলাকায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় এক ডজন মানুষ আহত হন। সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় যখন জামায়াতের দুই নারী কর্মী ভোট প্রচারের সময় ভুলবশত এক বিএনপি নেতার বাসায় যান। ওই আসনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপির এক প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করছেন। ঘটনার পর থেকে এলাকায় দুই দলের কর্মীদের সক্রিয় উপস্থিতি থাকায় সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সংঘর্ষস্থলের কাছে বসবাসকারী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তারা সংঘর্ষ চান না, তারা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে চান।
বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই একে অপরের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। জামায়াত নেতা জুবায়ের আহমেদ বলেন, সারা দেশে তাদের কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, প্রচার বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে এবং মিরপুরে তাদের নারী কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতা সাইমুম পারভেজ অভিযোগ করেন, জামায়াত কর্মীরা অবৈধভাবে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো দলীয় কোন্দল নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে, যার উদ্দেশ্য নির্বাচনকে অস্থিতিশীল করা। তার মতে, অনলাইনে ছড়ানো ভুয়া তথ্য বাস্তব সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে এবং নির্বাচন যদি নিয়ন্ত্রিত মনে হয়, তবে সহিংসতা আরও বাড়বে।
পুলিশ জানিয়েছে, রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় মাঠে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কুড়িগ্রাম জেলায় জুমার নামাজের পর বিএনপি ও জামায়াত কর্মীরা মুখোমুখি হলে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বহু বছর পর নির্বাচন আবার উৎসবের মতো মনে হচ্ছে, তবে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ায় সংঘর্ষের ঝুঁকিও বেড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের সহিংসতায় লুট হওয়া কিছু অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি এবং সেগুলো যাতে নির্বাচনি সহিংসতায় ব্যবহার না হয়, সেটাই পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার ৭৩০ জন সামরিক সদস্য রয়েছেন। দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষগুলো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আশ্বাস দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নেতা ড. ইউনূসের দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, আগের জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় এবারের সহিংসতা এখনো কম এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশ্বাস দেন। তবে সেই ব্রিফিং চলাকালেই লালমনিরহাট জেলায় বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং এতে প্রায় ২০ জন আহত হন।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের নয়াদিল্লি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সমর্থকদের অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের আহ্বান জানানোয় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম সুজনের সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সরকারি আশ্বাসের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইতিহাস থেকে জন্ম নেওয়া ভয় কাটিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।