চলতি বছরের জানুয়ারিতে যখন ভারতীয় কূটনীতিকরা মার্কিন শুল্ক কমানোর লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা করছিলেন, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছিল নয়াদিল্লি। তবে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে দৃশ্যপট বদলে গেছে। ইরান বনাম ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জেরে জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম ও সরবরাহ সংকটের মুখে ভারত ও মস্কো তাদের জ্বালানি সহযোগিতা আরও গভীর করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো রাশিয়া থেকে সরাসরি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। যদিও এই চুক্তিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে, তবে দুই দেশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আলোচনা চূড়ান্ত করতে পারে।
গত ১৯ মার্চ দিল্লিতে রাশিয়ার উপ-জ্বালানি মন্ত্রী পাভেল সোরোকিন এবং ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরীর মধ্যকার এক বৈঠকে এই ‘মৌখিক সমঝোতা’ হয়েছে। এছাড়া আগামী এক মাসের মধ্যে ভারতের মোট আমদানিকৃত তেলের অন্তত ৪০ শতাংশ রাশিয়া থেকে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা জানুয়ারির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারত গত বছর রাশিয়া থেকে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলারের তেল কিনে ক্রেমলিনের যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভারত আবারও রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
দ্বিমুখী সংকটে ভারত
কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করলেও গত এক বছরে ওয়াশিংটনের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তে ভারত অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করলে ভারত বাধ্য হয়ে রাশিয়ার তেল কেনা কমিয়ে দেয়। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারতের হিসাব পাল্টে যায়। ইরানের পাল্টা হামলায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতে রান্নার গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দেয়।
সরকারি এক নথি অনুসারে, অনেক নীতি নির্ধারক এখন আক্ষেপ করছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের মন রক্ষা করতে গিয়ে রাশিয়ার সস্তা তেল কেনা কমানো ঠিক হয়নি। ওই নথিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ভারতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা আরও ভারী হবে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া ভারতে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। এলএনজি চুক্তির পাশাপাশি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি ‘রোসেটি’ ভারতের পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন তৈরিতে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া আকাশপথে যোগাযোগ বাড়াতে সেন্ট পিটার্সবার্গের পুলকোভো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ভারতের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চালুর বিষয়ে আলোচনা করছে।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন, বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যের ৯৬ শতাংশই সম্পন্ন হচ্ছে রুপি ও রুবলের মাধ্যমে।
মুম্বাইয়ের এক সম্মেলনে জানানো হয়েছে, রুপি-রুবল লেনদেন এখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ভারত এখন রাশিয়ার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত অংশীদারত্বকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সূত্র: রয়টার্স
মাহফুজ/