মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার আশা ম্লান হয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও ভয়াবহ ও আগ্রাসী হামলার ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তারা আরও বিধ্বংসী হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) রাতে হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে চরম আঘাত করা হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানকে পাথর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ট্রাম্প জানান, আমেরিকা তার সামরিক লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি রয়েছে। ইরানের নেতারা যদি ওয়াশিংটনের শর্ত মেনে না নেন, তবে যুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। এমনকি ইরানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে সরাসরি হামলার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৯ ডলারে পৌঁছেছে। শেয়ারবাজারে বড় ধস নেমেছে এবং ডলারের মান শক্তিশালী হয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখন প্রায় বন্ধ। ইরান এই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী তেলের ট্যাংকারে হামলা চালাচ্ছে। ট্রাম্প জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোকে নিজেদের সুরক্ষা নিজেরা নিশ্চিত করতে বললেও ইউরোপীয় দেশগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ছাড়া সেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এই সংকটের সমাধান হবে না।
ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি এই হুমকির জবাবে বলেছেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য আরও বড় এবং বিধ্বংসী আক্রমণ অপেক্ষা করছে। শত্রুদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে বলে তিনি জানান। ইরানের পার্লামেন্ট এখন একটি আইন করার কথা ভাবছে, যার মাধ্যমে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে শত্রু-দেশের জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করবে এবং অন্যান্য জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায় করবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জবাবে ইরান ও তাদের মিত্ররা ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। ইরান দাবি করেছে, সাম্প্রতিক হামলায় তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জবাবে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ব্যবসায়িক ও শিল্প স্থাপনায় হামলা জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইতোমধ্যে ইসরায়েল, সৌদি আরব ও আবুধাবিতে বেশ কিছু ড্রোন ও মিসাইল হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের দ্রুত ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এশিয়ায় জ্বালানিসংকট তীব্র হয়েছে এবং ইউরোপেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতার মুখে পড়েছে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবছে।
কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে
এরই মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ইরানের কিছু নেতার সঙ্গে আলোচনা করছেন। তবে ইরানের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তারা আগে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা চায়। অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন বলে জানা গেছে। পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব দিলেও আমেরিকা তাতে অংশ নেবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বর্তমানে গোটা বিশ্ব এক গভীর অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।
মার্কিন জনগণকে খোলা চিঠি ইরানের প্রেসিডেন্টের
মার্কিন জনগণের উদ্দেশে এক দীর্ঘ খোলা চিঠি লিখে সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বর্তমানে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যে সংঘাত চলছে, তাতে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের আদতে কী স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে, সেই কঠোর প্রশ্নই তুলেছেন তিনি। পেজেশকিয়ানের মতে, এই যুদ্ধ কেবল ব্যয়বহুল নয়, এটি অকারণে সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
চিঠিতে পেজেশকিয়ান সরাসরি ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘আগে আমেরিকা’ নীতিকে বিঁধেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালিয়ে মার্কিন প্রশাসন কি সত্যিই তাদের দেশের মানুষের ভালো করছে? তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমেরিকা এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। এতে আমেরিকার সাধারণ মানুষের কোনো লাভ হচ্ছে না। বরং এই সংঘাতের ফলে দুই পক্ষকেই বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
খোলা চিঠিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেছেন, আমেরিকা ইরানের জ্বালানি খাত এবং শিল্প-পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এর ফলে সরাসরি ইরানের সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পেজেশকিয়ান এই হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং জানিয়েছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পরিণাম হবে সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক বার্তার বিপরীতে মার্কিন জনগণের আবেগ ও যুক্তির কাছে আবেদন জানিয়ে এক নতুন কূটনৈতিক লড়াই শুরু করলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর রকেট ও ড্রোন হামলা হিজবুল্লাহর
ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর রকেট ও ড্রোন হামলার খবর জানিয়েছে লেবাননের ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ১০ মিনিটের দিকে লেবাননের মালিকিয়াহ ও ইয়েরুন এলাকায় হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা রকেট হামলা চালান।
আল জাজিরার খবরে বলা হয়, কাছাকাছি সময়ে লেবাননের মেনাহেম এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ড্রোন হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। এসব হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি বাহিনী এখনো কিছু জানায়নি।
এদিকে ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি স্পষ্ট জানিয়েছেন, শত্রুপক্ষ যদি ইরানের মাটিতে কোনো ধরনের ‘গ্রাউন্ড অপারেশন’ বা স্থল অভিযান চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে একজন আক্রমণকারীকেও জীবিত ফিরতে দেওয়া হবে না। বৃহস্পতিবার দেশের সব কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টারের সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক অনলাইন ভাষণে তিনি এই ‘নো কোয়ার্টার’ (কাউকে রেহাই না দেওয়া) নীতি ঘোষণা করেন।
মেজর জেনারেল হাতামি স্থল, নৌ এবং বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ প্রতি মুহূর্তে বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, ‘ইরানি সেনাবাহিনী রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক–উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ণ প্রস্তুত। আমাদের লক্ষ্য দেশ থেকে যুদ্ধের কালো মেঘ সরিয়ে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’