সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান খুব শিগগির হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে–এমন সম্ভাবনা কম। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথের ওপর নিয়ন্ত্রণই এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেহরানের প্রধান চাপ প্রয়োগের অস্ত্র। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র এমনটাই জানিয়েছে।
এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, তেহরান ইচ্ছাকৃতভাবে প্রণালি দিয়ে চলাচল সীমিত রেখে জ্বালানির দাম উঁচু রাখতে পারে, যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর দ্রুত যুদ্ধের সমাপ্তির জন্য চাপ তৈরি হয়। প্রায় পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনপ্রিয় নয়।
প্রতিবেদনগুলো আরও ইঙ্গিত দেয়, ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ উল্টো দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ তেহরান দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা চাইলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন হয়। তবে ট্রাম্প এই পথ পুনরায় চালু করার জটিলতাকে কম করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। গত শুক্রবার তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে বলেন, কিছুটা সময় পেলে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই এই প্রণালি খুলে দিতে পারবে এবং সেখান থেকে তেল নিয়েও লাভ করতে পারবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে তা ব্যয়বহুল হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে। আলী ভায়েজ বলেন, ইরানকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরিতে বাধা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আসলে তাদের হাতে ‘বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় সৃষ্টির অস্ত্র’ তুলে দিয়েছে। তার মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে–এ বিষয়টি তেহরান ভালোভাবেই বুঝেছে।
প্রণালি পুনরায় চালুর প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। একদিকে তিনি এটিকে যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে উপসাগরীয় তেলনির্ভর দেশ ও ন্যাটো মিত্রদের এ দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প আশাবাদী যে খুব শিগগির প্রণালি খুলে যাবে এবং তিনি স্পষ্ট করেছেন যে যুদ্ধ শেষে ইরানকে এই জলপথ নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন, এই বিষয়টি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অন্য দেশগুলোর স্বার্থ বেশি জড়িত।
এদিকে ইরানের শক্তিশালী বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা বেসামরিক জাহাজে হামলা, মাইন পাতা এবং চলাচলের জন্য ফি দাবি করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং যেসব দেশ উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ায় মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক হতে পারে। সামনে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার দল রিপাবলিকান পার্টিও চাপে রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ইরান এই প্রভাব এত সহজে ছেড়ে দেবে না। তাদের মতে, একবার এই শক্তির স্বাদ পাওয়ার পর তেহরান তা ধরে রাখার চেষ্টা করবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রণালি পুনরায় চালু করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালি সবচেয়ে সরু জায়গায় মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, আর জাহাজ চলাচলের পথ দুই দিকেই প্রায় ৩ কিলোমিটার করে, যা সহজেই হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের দক্ষিণ উপকূল বা দ্বীপগুলো দখলও করে, তবু ইরান তাদের ভেতরের অঞ্চল থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র এক-দুটি ড্রোন দিয়েই জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা সম্ভব।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধ শেষ হলেও ইরান এই নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। কারণ যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনের জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে, আর প্রণালি দিয়ে চলাচলের ওপর ফি আরোপ করা হতে পারে সেই অর্থের একটি উৎস।
সাবেক সিআইএ পরিচালক বিল বার্নস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরান এই প্রভাব ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনায় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করবে। পাশাপাশি তারা সরাসরি আর্থিক সুবিধা, যেমন জাহাজ চলাচলে ফি আদায় নিশ্চিত করতেও চাইবে। তার ভাষায়, এই পরিস্থিতি বর্তমানে আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। সূত্র: রয়টার্স