মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। পোস্টে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ভাই’ বলে সম্ভোধন করেন এবং ‘এই অঞ্চলে যুদ্ধ শেষ করার জন্য তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টার’ জন্য ‘কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা’ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে আরাগচির এই পোস্টটি শেয়ার করেন, যা শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।
এর কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স-এ এক পোস্টে বলেন, ‘অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি ঘোষণা করছি যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিয়ে লেবাননসহ সর্বত্র অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।’
তিনি লেখেন, ‘‘আমি এই বিচক্ষণ পদক্ষেপকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই এবং উভয় দেশের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি তাদের প্রতিনিধিদলকে সকল বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আগামী শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি যে, ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ একটি টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে এবং আগামী দিনগুলোতে আমরা আরও সুসংবাদ জানাতে পারব।’’
সিবিএস নিউজ জানায়, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল মুনিরের সঙ্গে কথা বলেছেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, ফিল্ড মার্শাল মুনির যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে ‘সারা রাত ধরে’ যোগাযোগে ছিলেন।
পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’
তাহলে ওয়াশিংটন ও তেহরান কীভাবে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলো? এর উত্তর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির নেতৃত্বে এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল মুনিরের মধ্যস্থতায় পরিচালিত নিপুণ কূটনীতিতে।
মার্চের শেষভাগ থেকে ইসলামাবাদ উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তির জন্য চাপ দিয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য গত ২৯ মার্চ দেশটি তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানায়।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়েই যখন একটি সমাধানের পথ খুঁজছিল, তখন পাকিস্তান পর্দার আড়ালের আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
পাকিস্তানই যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবটি ইরানের কাছে পৌঁছে দেয় এবং পরে ইরানের জবাবগুলো ওয়াশিংটনে পাঠায়।
কেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই ইসলামাবাদকে বিশ্বাস করে
কোনো সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হতে হলে একটি দেশকে উভয় পক্ষের আস্থাভাজন হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণে ইরান তার আরব প্রতিবেশীদের আর বিশ্বাস করে না। বস্তুত, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে বোমা হামলাও চালিয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান, যার ইঙ্গিত পাওয়া যায় আব্বাস আরাগচির পোস্টে ‘প্রিয় ভাই’ হিসেবে শরিফ ও মুনিরকে সম্ভোধন করার মাধ্যমে।
এ ছাড়াও, ফিলিস্তিন সমস্যার কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। এটিও আরেকটি কারণ, যার জন্য তেহরান পাকিস্তানকে বিশ্বাস করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, গত বছরের তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। ইসলামাবাদ ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এও যোগ দিয়েছে, যার লক্ষ্য গাজায় শান্তি নিশ্চিত করা।
ট্রাম্প ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিরক্ষা বিভাগে আসিফ মুনিরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে, যা এ ধরনের আলোচনায় পাকিস্তানকে বাড়তি সুবিধা দেয়।
এর পাশাপাশি, অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও পাকিস্তানের সুসম্পর্ক রয়েছে, যা দেশটিকে সংঘাত থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে সবাইকে নিয়ে চলার সুযোগ করে দেয়।
পাকিস্তানেরও যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন ছিল
পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা শুধু বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা দখলের তাগিদই নয়, বরং এর পেছনে বাস্তবসম্মত কারণও রয়েছে। দেশটি তার তেলের সিংহভাগ মধ্যপ্রাচ্য থেকে পায় এবং বহু পাকিস্তানি এই অঞ্চলে কাজ করে দেশে রেমিটেন্স পাঠায়। এ অঞ্চলের উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে ইরানের অবরোধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা পাকিস্তানকে দাম বাড়াতে বাধ্য করেছে এবং শাহবাজ শরিফ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
আর এই ঘটনাটি ঘটছে পাকিস্তানের বিদ্যমান আর্থিক সংকট এবং প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ এবং আরেক প্রতিবেশী দেশ ইরানের অস্থিতিশীলতা তার স্বার্থের পরিপন্থি। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। এতে বেশ কয়েকজন নিহত হন।
যুদ্ধবিরতির বিষয়ে পাকিস্তানের নিজের স্বার্থও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উভয় পক্ষের আস্থা অর্জনে সাহায্য করে। আর চীনের দৃঢ় সমর্থন এর বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দেয়। সূত্র: এনডিটিভি
অমিয়/