ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়েছে। এখন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের বড় প্রশ্ন, এই প্রভাব খাদ্যের দামে কবে এবং কতটা জোরে পড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, আসল প্রভাব এখনো পুরোপুরি দেখা যায়নি। কারণ কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ার পর বাজারে খাবারের দামে তা প্রতিফলিত হতে কিছুটা সময় লাগে। এই প্রভাব কতটা গুরুতর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কতদিন বিঘ্নিত থাকে তার ওপর। এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপথে পরিবাহিত সার এবং এক-চতুর্থাংশ তেল পরিবহন হয়।
জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক মাটিন কাইয়িম বলেন, ‘আগামী মাসগুলোতে খাদ্যের দাম অবশ্যই বাড়বে। ফলে বিশ্বের অনেক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবারের পেছনে খরচ হয়। এর ফলে ক্ষুধা ও অপুষ্টি বাড়তে পারে।
গত সপ্তাহে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হলে তা বৈশ্বিক খাদ্য ‘বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে। ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, সোমালিয়া, সুদান, তানজানিয়া, কেনিয়া ও মিসর।
এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম জানিয়েছে, যদি সংঘাত বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলতে থাকে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে আরও প্রায় ৪৫ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। এখন পর্যন্ত খাদ্যের দাম তুলনামূলক কম হারে বেড়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সূচক অনুযায়ী, গত মাসে বৈশ্বিক খাদ্যের দাম ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। সিরিয়ালের (ধান-গমজাত খাদ্য) দাম বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে ২০২২ সালের তুলনায় এখনো খাদ্যের দাম গড়ে প্রায় ১১ শতাংশ কম, যখন বাজারে একসঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন রাশিয়ার আগ্রাসনে প্রভাব পড়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বর্তমানে যে খাদ্য বিশ্বজুড়ে খাওয়া হচ্ছে, তার বেশির ভাগই যুদ্ধ শুরুর আগেই উৎপাদিত হয়েছিল। এ ছাড়া বৈশ্বিক শস্য উৎপাদনও এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের শেষে বৈশ্বিক শস্য মজুত ৯৫১ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও।
নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক সান্দ্রো স্টেইনবাখ বলেন, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি ‘মিশ্র সংকেত’। এটি পুরো পরিস্থিতির স্পষ্ট ধারণা দেয় না। কারণ উৎপাদন খরচের ধাক্কা বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে। ইতালির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফন্ডাজিওনে সিএমসিসির গবেষক সৌর দাসগুপ্ত বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে জ্বালানির দাম বাড়লে তা সরাসরি খাদ্যের দামে প্রভাব ফেলে। কারণ এসব দেশে পরিবহন খরচ পরিবারের মোট ব্যয়ের বড় অংশ।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য ফসলের ক্ষতির আগেই জ্বালানি খরচ বাড়ায় ঢাকা, মিসর ও লাগোসের মতো শহরগুলোতে খাদ্য ব্যয় ইতোমধ্যেই বেড়ে গেছে। খাদ্যের দাম বাড়লে পরিবারগুলো সাধারণত ফল, সবজি ও প্রোটিনজাত খাবার কমিয়ে সস্তা ও বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে শিশুদের পুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা