ইতালি ২০১৭ সালে নতুন বাসিন্দাদের জন্য একটি বিশেষ কর আইন চালু করে। এতে বিদেশি নাগরিকরা ইতালির প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে। যদিও এই বিশেষ কর আইনের জন্য ফ্রান্স সরকার দেশটির প্রতি অভিযোগ তুলে কড়া সমালোচনা করেছে। ফ্রান্স সরকারের দাবি, ধনী ফরাসিরা এই করব্যবস্থায় আকৃষ্ট হয়ে ইতালিতে পাড়ি জমাচ্ছেন। আর বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা সংশয়ে ইতালি ধনীদের জন্য আরও বেশি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
ফ্রান্স থেকে চলে আসা ফরাসি নাগরিক রবার্ট বলেন, ‘ফ্রান্স ছাড়ার মূল কারণ কর ছিল না। ইতালির সৌন্দর্য, সুন্দর জীবন, শিল্পকলা ও সংগীত ইতালি আসতে আমাকে আকৃষ্ট করেছে। তবে আমাদের মতো ফ্রান্স থেকে চলে আসা নাগরিকদের জন্য রোমে একটি বাড়ি কেনা এবং কর-নিবাসী হওয়াটা চমৎকার এক সুবিধার অংশ। কারণ উচ্চধনীরা তাদের সমস্ত বিদেশি আয়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক কর প্রদান করতে পারেন। এ ছাড়া এ ধরনের আরও নানা ধরনের ছাড় উপভোগ করতে পারেন।’
রবার্ট যদি ফ্রান্সে একটি বাড়ি কিনতেন, তা হলে তাকে আইনজীবীর ফি দিতে হতো। ওই ফির বেশির ভাগই ফরাসি সরকারের কাছে চলে যেত। বিষয়টা অনেকটা যুক্তরাজ্যের স্ট্যাম্প ডিউটি বা যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল এস্টেট ট্রান্সফার ট্যাক্সের মতো। তবে ইতালি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দেশটিতে প্রথম বাড়ি কেনার জন্য ছাড় রয়েছে। এ ছাড়াও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ নিজ দেশে সম্পদ করকে ‘স্থাবর সম্পত্তি সম্পদ কর’ হিসেবে রূপান্তরিত করেছেন। এর প্রভাবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রবার্ট বলেন, ‘যদি আপনার দশ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পত্তি থাকে, তা হলে এই কর সত্যিই খুব কষ্টদায়ক। আবারও বলছি, ইতালিতে এমন কিছুই নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, ইতালিতে মালিকানাধীন সম্পত্তির ওপর ১ মিলিয়ন ইউরো (১ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত কোনো উত্তরাধিকার কর নেই। এই সীমার ওপরে করের হার মাত্র ৪ শতাংশ। কিন্তু ফ্রান্সে করমুক্ত সীমা অনেক কম, ১ লাখ ইউরো (১ লাখ ১০ হাজার ডলার) হলেই কর গুনতে হয়। এর ওপরে করের হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে, যা সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।’
ইতালিতে কর কর্তৃপক্ষ আয়ের ওপর ধার্য করা করের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে উপার্জনকারীকে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কর দিতে হবে। কখনোই তার চেয়ে বেশি কর দিতে হয় না। বর্তমানে এই করের সীমা ৩ লাখ ইউরো (৩ লাখ ৫৩ হাজার ডলার)। তবে এটি কিছুদিন আগে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে এটির সীমা ছিল ১ লাখ ইউরো। ফলে ফরাসি নাগরিক যাদের আয় ১০ লাখ ইউরো, তাদের জন্য ইতালি ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’-এ পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন নাগরিকদের বিশ্বব্যাপীই নিজেদের আয়ের ওপর সর্বদা কর দিতে হয়। তাই ইতালিতে চলে গেলেও তাদের করের বোঝা কমবে না।
প্যারিসভিত্তিক করবিষয়ক আইনজীবী জেরোম বারে ব্যাখ্যা করেন, ‘এই পর্যায়ে ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকেই বেশি প্রশ্ন আসছে যে তারা স্থানান্তর হবেন কি না। তবে স্থানান্তরের জন্য তাদের পূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং সতর্ক কাঠামোর প্রয়োজন। কারণ স্থানান্তরের জন্য ব্যবসার মালিকদের কোম্পানির সদর দপ্তর পরিবর্তন করতে হয়। এ ছাড়াও ফ্রান্স ত্যাগ করার সময় তাদের একটি প্রস্থান কর দিতে হয়।’
তবে ‘স্থানান্তরের চিন্তাভাবনা’ শুধু ধনী ফরাসিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনেকেও এ ধরনের চিন্তাভাবনা করছেন। আর তাতে হাওয়া জোগাচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি।
দুবাইয়ের করমুক্ত ব্যবস্থা আছে। যেখানে এই এরকম কোনো করের বাধ্যবাধতা নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা সংশয়ে অনেকে এ রকম চিন্তা-ভাবনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ বিষয়ে হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের পিটার ফেরিগনো বলেন, ‘এটা অবশ্যম্ভাবী যে অনেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাত নিয়ে নতুন করে ভাববেন। কিন্তু আমার মনে হয়–কাজ, পরিবার ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোতে মানুষের জন্য এখনই সবকিছু ওলটপালট করে ফেলার সময় আসেনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ যদি তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী হয়, তবে তারা এখানেই থাকবেন। আর যদি তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মানুষ অনিবার্যভাবে অন্যত্র চাকরি খুঁজবে, অথবা পরিস্থিতি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত পরিবারকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে কাজ করবে।’
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অনেক ধনী ইউরোপীয়কে সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থানান্তরিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিবিসি। সূত্র: বিবিসি