ইরান যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত’ শেষ হবে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেশির ভাগ মানুষই বুঝতে পারছে যে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করাই তার মূল লক্ষ্য। এদিকে ইরান জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব এখনো তারা পর্যালোচনা করছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস মনে করছে তারা ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারকের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই স্মারক ভবিষ্যতের বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার ভিত্তি হতে পারে।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য এই প্রস্তাবকে ‘ইচ্ছার তালিকা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব সম্পর্কে নিজেদের মতামত জানাবে তেহরান।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তার দেশ যুদ্ধবিরতিকে ‘স্থায়ী শান্তিতে’ রূপ দিতে কাজ করছে। অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এক পাতার ওই ১৪ দফা স্মারকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার মতো বিষয় রয়েছে।
প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা এবং আরও দুটি সূত্রের বরাত দিয়েছে, যদিও তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব শর্তের অনেকটাই চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ওপর নির্ভর করবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সও জানিয়েছে, মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র অ্যাক্সিওসের তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে এখনো প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
গত বুধবার এক ভার্চুয়াল প্রচার অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, তিনি আশাবাদী যে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। তার ভাষায়, অধিকাংশ মানুষই বোঝে যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ না দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত।
এর আগে তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো আলোচনা’ হয়েছে এবং একটি চুক্তি সম্ভব। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে আমেরিকানদের যে কষ্ট হচ্ছে, সেটি সাময়িক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি বলেন, ‘আমেরিকার প্রস্তাব এখনো ইরান পর্যালোচনা করছে। সিদ্ধান্তের পর পাকিস্তানকে আমাদের অবস্থান জানানো হবে।’
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘যে যুদ্ধে আমেরিকা হারছে, সেখানে মুখোমুখি আলোচনায় যা পায়নি, যুদ্ধ করেও তা পাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ইরান ‘ট্রিগারে আঙুল রেখেছে’ এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ছাড় না দিলে ‘কঠোর ও অনুতাপজনক জবাব’ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে আবারও বোমা হামলা শুরু হবে এবং তা আগের চেয়ে ‘অনেক বেশি তীব্র’ হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রাথমিক সামরিক অভিযান অপারেশন এপিক ফিউরি শেষ হবে ‘যদি ইরান সম্মত শর্তগুলো মেনে নেয়’। এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, অভিযানটি লক্ষ্য পূরণ করেছে।
ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, ইরান ‘কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না’–এমন বিষয়ে সম্মত হয়েছে। যদিও তেহরান এই দাবি নিশ্চিত করেনি। তিনি বলেন, ‘তারা চুক্তি করতে চায়। গত ২৪ ঘণ্টায় খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। আমার মনে হয়, আমরা জিতেছি।’
এদিকে ট্রাম্প মঙ্গলবার ঘোষণা করেন, তিনি প্রজেক্ট ফ্রিডম সাময়িকভাবে স্থগিত করছেন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে আটকেপড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনা এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করা। ইরান আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দিলেও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ইঙ্গিত দিয়েছে, ‘আগ্রাসীদের হুমকি’ বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যেতে পারে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে কার্যত ইরান এটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও এখনো খুব কম জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতেও অবরোধ আরোপ করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, গত বুধবার ওমান উপসাগরে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে অচল করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান ইস্যুতে তার সঙ্গে ট্রাম্পের ‘পূর্ণ সমন্বয়’ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এক। ইরানের সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলা এবং তাদের সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া।’
এই মন্তব্যের কিছুক্ষণ পরই এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর প্রথমবারের মতো বৈরুতে হামলা চালায় ইসরায়েল। নেতানিয়াহু বলেন, হামলায় হিজবুল্লাহর এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যিনি ইসরায়েলি বসতিতে হামলা এবং ইসরায়েলি সেনাদের ক্ষতির জন্য দায়ী ছিলেন।
ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ মার্চের শুরুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরকে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্র: আল জাজিরা