দুই দিনের সফরে গতকাল সোমবার উত্তর কোরিয়া গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তার এই সফরকে অনেকেই বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখলেও বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। বেইজিংয়ের কাছে উত্তর কোরিয়া এমন এক প্রতিবেশী, যাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, আবার হারানোর ঝুঁকিও নেওয়া যায় না।
কোরিয়া যুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ের স্মারক হিসেবে চীন ও উত্তর কোরিয়া দুই দেশের সম্পর্ককে প্রায়ই ‘রক্তের বন্ধন’ বলে বর্ণনা করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বেড়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ধারণা, শি জিনপিং উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে বেইজিংয়ের অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠতা বেইজিংকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর শি জিনপিং সম্ভবত নিশ্চিত হতে চান যে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পুরোপুরি মস্কোর প্রভাব বলয়ে চলে যাচ্ছেন না।
রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর পিয়ংইয়ং ও মস্কোর সামরিক সহযোগিতা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালে পুতিনের পিয়ংইয়ং সফরের সময় দুই দেশ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
এ ছাড়া উত্তর কোরিয়ার সেনারা ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করেছে এবং দেশটি রাশিয়াকে গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিনিময়ে তারা জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহায়তা পেয়েছে।
চীনের আশঙ্কা হলো, যদি রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে, তাহলে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব কমে যাবে।
সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে গত বছর শি জিনপিং কিম জং উনকে বেইজিংয়ে সামরিক কুচকাওয়াজে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে কিমকে নিজের পাশে এবং পুতিনের কাছাকাছি অবস্থানে রাখা হয়েছিল।
ছয় বছর পর এটি ছিল শি ও কিমের প্রথম আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠক। শি দুই দেশকে ‘ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু ও অভিন্ন ভাগ্যের সহযাত্রী’ বলে অভিহিত করেন।
চীন উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে না। এতে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে, যা বেইজিংয়ের জন্য অস্বস্তিকর।
তবে চীন আবার সরাসরি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধেও অবস্থান নেয় না। ২০২২ সালে চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাবে ভেটো দেয়। চীনের ধারণা, অতিরিক্ত চাপ দিলে উত্তর কোরিয়া আরও বেশি রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়বে।
যদিও কিম জং উন রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন, তবু তিনি চীনকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেন না। গত বছর চীনের রপ্তানি উত্তর কোরিয়ায় প্রায় ২৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ বছর দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও পুনরায় শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো উত্তর কোরিয়াকে আবার চীনের প্রভাব বলয়ে ফিরিয়ে আনার বেইজিংয়ের পরিকল্পনার অংশ।
শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরের মূল উদ্দেশ্য–উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের রাজনৈতিক প্রভাব পুনরায় শক্তিশালী করা, পিয়ংইয়ং-মস্কো ঘনিষ্ঠতার ফলে চীনের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করা, কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা।
শি জিনপিংয়ের উত্তর কোরিয়া সফর মূলত বন্ধুত্বের প্রদর্শনের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ। উত্তর কোরিয়া চীনের জন্য একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি নিরাপত্তা বাফার, অন্যদিকে একটি অপ্রত্যাশিত ও ঝুঁকিপূর্ণ মিত্র। তাই বেইজিং চাইছে কিম জং উনকে নিজের প্রভাব বলয়ের মধ্যে রাখতে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার কারণে চীন কোনো নতুন আঞ্চলিক সংকটে জড়াতে চায় না। এ কারণেই শি জিনপিংয়ের পিয়ংইয়ং সফরকে অনেক বিশ্লেষক ‘বন্ধুত্ব নয়, প্রভাব ধরে রাখার কূটনীতি’ হিসেবে দেখছেন। সূত্র: বিবিসি