যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা মরুভূমির বুকে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় ঘাঁটি ‘এরিয়া ৫১’। আকাশপথ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, চারপাশে কড়া পাহারা আর দশকের পর দশক আমেরিকান সরকারের নীরবতা। এ কারণে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে অগণিত প্রশ্ন, এখানে কি সত্যিই ভিনগ্রহের প্রাণী বন্দি আছে? আমেরিকা কি গোপনে অ্যালিয়েন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে? নাকি সবই নিছক কল্পকাহিনি, যার জায়গা হওয়া উচিত কেবল বিজ্ঞানকল্পের পাতায়?
১৯৫৫ সালে এরিয়া ৫১ প্রতিষ্ঠিত হয়। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক জায়গার প্রয়োজন বোধ করে, যেখানে গোপনে তাদের গুপ্তচর বিমান পরীক্ষিত হতে পারে। সেই প্রয়োজন থেকেই গ্রুম লেকের শুকনো প্লাবনভূমিতে শুরু হয় ‘U-2’ স্পাই প্লেনের পরীক্ষা। পরে একে একে ‘A-12 OXCART’, ‘SR-71 Blackbird’ আর প্রথম স্টেলথ যুদ্ধবিমান ‘F-117 Nighthawk’-এর মতো যুগান্তকারী প্রকল্প চালু হয় সেখানে। এসব বিমান এত উঁচু দিয়ে ও এমন গতিতে উড়ত যে সাধারণ মানুষ চোখে দেখে ভাবতেন, এটি নিশ্চয় কোনো ভিনগ্রহী যান। ফলে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে যে অগণিত ‘উড়ন্ত চাকতি’ দেখা গিয়েছিল, তার বেশির ভাগই আসলে ছিল এরিয়া ৫১ থেকে উড়ানো পরীক্ষামূলক বিমান।
এই ঘাঁটির নিরাপত্তা এতটাই কঠোর ছিল যে, দশকের পর দশক আমেরিকান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এর অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। কর্মীরা সেখানে যাতায়াত করতেন বিশেষ বিমানে, যাকে স্থানীয়রা ডাকত ‘জ্যানেট ফ্লাইটস’। এমনকি মানচিত্রেও এরিয়া ৫১-এর কোনো উল্লেখ ছিল না। ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হতে থাকে এবং মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, যদি কেবল বিমান পরীক্ষা হতো, তবে এত গোপনীয়তার প্রয়োজন কেন?
তবুও এরিয়া ৫১ নিয়ে গুজব থেমে থাকেনি। ১৯৪৭ সালের রসওয়েল ঘটনাই এর ভিত্তি তৈরি করে দেয়। নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে অদ্ভুত কিছু ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়েছিল সে বছর। সেনাবাহিনী প্রথমে ঘোষণা দেয়, তারা একটি ‘উড়ন্ত ডিস্ক’ উদ্ধার করেছে। পরে কথা বদলে বলা হয়, সেটি ছিল আবহাওয়া বেলুন। এ দ্বিধা মানুষের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রতিবেদনে জানানো হয়, আসলে সেটি ছিল ‘প্রজেক্ট মোগুল’ নামের এক গোপন পরীক্ষামূলক বেলুন, যা সোভিয়েত পারমাণবিক পরীক্ষা শনাক্তের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। তথাকথিত ‘অ্যালিয়েন দেহ’ও ছিল পরীক্ষামূলক ডামি বা সামরিক দুর্ঘটনার ফল। তবু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তখন থেকে জনমানসে রোপিত হয়।
১৯৮৯ সালে রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন বব লাজার নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি এরিয়া ৫১-এর কাছে একটি স্থানে এলিয়েন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানান, সেখানে ভিনগ্রহী উড়োজাহাজের ইঞ্জিন উল্টোপথে বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল। যদিও তার দাবি প্রমাণিত হয়নি এবং তার জীবনীসংক্রান্ত নথিতে অসংখ্য অসংগতি ছিল। তবু লাজারের বর্ণনা জনসাধারণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সংবাদমাধ্যমে তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর থেকে এরিয়া ৫১-কে ঘিরে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ঢেউ আরও উঁচুতে ওঠে। অনেক গবেষক তাকে ভুয়া প্রমাণ করলেও, তার গল্প পপ সংস্কৃতিতে এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে বহু মানুষ আজও এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
জনপ্রিয় সংস্কৃতিও এই রহস্যকে আরও জোরদার করেছে। ‘দ্য এক্স ফাইলস’ টিভি সিরিজ বা ‘ইন্ডিপেনডেন্স ডে’ সিনেমার মতো কাজগুলোতে এরিয়া ৫১-কে সরাসরি এলিয়েনদের ঘাঁটি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব কল্পচিত্র কোটি মানুষের মনে প্রভাব ফেলেছে। ২০১৯ সালে তো একেবারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় ‘স্টর্ম এরিয়া ৫১’ ইভেন্ট। যেখানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঘোষণা দেন, তারা একসঙ্গে এরিয়া ৫১-তে ঢুকে অ্যালিয়েনদের মুক্ত করবেন। যদিও শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয় উৎসবে, নেভাদার ছোট্ট শহর র্যাচেলে জমে ওঠে এলিয়েন থিমযুক্ত কনসার্ট ও পার্টি। স্থানীয় শেরিফ দপ্তরের হিসাবে প্রায় ৫-৬ হাজার মানুষ সেখানে জমায়েত হয়েছিল।
অন্যদিকে আমেরিকান সরকারও ধীরে ধীরে কিছু তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে। ২০১৩ সালে সিআইএ প্রথমবার স্বীকার করে, এরিয়া ৫১ আসলেই আছে। সেখানে গোপন বিমান পরীক্ষার কাজ হয়েছে। এরপর নৌবাহিনীর কিছু রহস্যময় ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর কংগ্রেসে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, বহু অজ্ঞাত উড়ন্ত ঘটনার ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলেও কোনো প্রমাণ নেই যে সেগুলো ভিনগ্রহ থেকে এসেছে। প্রতিরক্ষা দপ্তর বিশেষ ইউনিট ‘AARO (All-domain Anomaly Resolution Office)’ গঠন করে এসব নিয়ে গবেষণা করছে। নাসার স্বাধীন প্যানেলও জানিয়েছে, এ পর্যন্ত কোনো ঘটনারই ভিনগ্রহী উৎসের প্রমাণ মেলেনি। এমনকি মার্কিন কর্মকর্তারা সরাসরি ঘোষণা করেছেন- তাদের কাছে ভিনগ্রহী জীব বা প্রযুক্তি থাকার কোনো তথ্য নেই।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘অজানা মানেই ভিনগ্রহী নয়।’ অধিকাংশ ‘UFO (Unidentified Flying Object)’ ঘটনারই ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে কখনও শুক্র গ্রহের আলো, কখনো উল্কাপাত, আবার কখনো স্টারলিংক স্যাটেলাইটের প্রতিফলন। এর পাশাপাশি আছে পরীক্ষামূলক ড্রোন বা সামরিক বিমান। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৬০-এর দশকে ইউ-২ বিমান যখন ৬০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ত, তখন যাত্রীবাহী বিমানের পাইলটরা নিচ থেকে সেটিকে আগুনের গোলার মতো অজানা বস্তু মনে করতেন। আবার সাম্প্রতিক কালে আকাশে সারি সারি আলো দেখে বহু মানুষ ‘এলিয়েন বহর’ ভেবে ভয় পেয়েছেন। অথচ পরে দেখা গেছে, সেগুলো আসলে স্টারলিংক স্যাটেলাইট। বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের ভাষায়, ‘অসাধারণ দাবির জন্য প্রয়োজন অসাধারণ প্রমাণ’ যা এখন পর্যন্ত ইউএফওর ঘটনার ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি।
তবু এরিয়া ৫১ ঘিরে মানুষের আগ্রহ কমেনি। নেভাদার হাইওয়ে–৩৭৫-এর ডাকনাম এখন ‘এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল হাইওয়ে’। সেখানে এলিয়েন থিমযুক্ত রেস্তোরাঁ ও দোকান পর্যটকদের আকর্ষণ করে। প্রতি বছর হাজারো কৌতূহলী ভ্রমণকারী সেখানে যান শুধু রহস্যময় সেই ঘাঁটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছে অ্যালিয়েন স্মারক সামগ্রী, হোটেল ও ক্যাফে। ফলে বোঝা যায়, এরিয়া ৫১ হয়ে উঠেছে শুধু সামরিক ইতিহাসের অংশ নয়, বরং কল্পনারও কেন্দ্রবিন্দু।
অতএব, এরিয়া ৫১ একই সঙ্গে বাস্তব ও কল্পনার প্রতীক। একদিকে এখানে জন্ম নিয়েছে যুগান্তকারী বিমান প্রযুক্তি। অন্যদিকে এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, অজানার প্রতি আমাদের কৌতূহল রহস্যকে টিকিয়ে রাখে। যত দিন না অকাট্য প্রমাণ আসে, এরিয়া ৫১ হয়তো বিজ্ঞান ও কল্পনার এই মিশ্র প্রতীক হিসেবে থেকে যাবে, আর পাঠকের মনে জাগিয়ে তুলবে একই সঙ্গে বিস্ময় ও রোমাঞ্চ। উৎস: ব্রিটানিকা বিশ্বকোষ, নাসা


