ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে, যার সমাধান আজও মেলেনি। এমনই এক অমীমাংসিত রহস্য ‘ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ বা ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি। প্রায় ৬০০ বছর ধরে বিশ্বের তাবড় ভাষাবিদ ও ক্রিপ্টোগ্রাফাররা এর পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অনেকে মনে করতেন, এটি নিছকই অর্থহীন আঁকিবুঁকি। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। এই পাণ্ডুলিপি সম্ভবত পঞ্চদশ শতকের একটি জটিল সাংকেতিক বার্তা বা ‘এনক্রিপ্টেড টেক্সট’, যা নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম মেনে লেখা হয়েছে।
ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি আসলে কী?
ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি সাড়ে ২৩ বাই ১৬ সেন্টিমিটার আকারের একটি বই, যার পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় ২৪০। ধারণা করা হয়, এটি ১৪০০ সালের দিকে বা পঞ্চদশ শতকে লেখা। বইটির পাতায় পাতায় রয়েছে অদ্ভুত সব বৈজ্ঞানিক ও উদ্ভিদবিদ্যার চিত্র। সবুজ, বাদামি, হলুদ, নীল ও লাল কালিতে আঁকা এই চিত্রগুলোর পাশে যে ভাষায় বর্ণনা লেখা হয়েছে, তা আজও মানুষের অজানা।
দীর্ঘদিন ধরে গবেষকদের মধ্যে একটি বিতর্ক চলছে। এক পক্ষের মতে, এটি কোনো প্রকৃত ভাষা যা সংকেতে লেখা। অন্য পক্ষের দাবি, এটি শুধু ‘জিবারিশ’ বা অর্থহীন প্রলাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির বিজ্ঞান সাংবাদিক মাইকেল গ্রেশকো এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। বিখ্যাত ‘ক্রিপ্টোলজিয়া’ জার্নালে প্রকাশিত তার গবেষণাপত্রে তিনি দাবি করেছেন, ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি আসলে এক ধরনের ‘সাইফারটেক্সট’। তার এই তত্ত্ব প্রমাণের জন্য তিনি ‘নাইব সাইফার’ নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি এনক্রিপশন বা সংকেত পদ্ধতি তৈরি করেছেন। তার তৈরি এই পদ্ধতিতে লেখা লিপি দেখতে হুবহু ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির মতো।
গ্রেশকোর মতে, পঞ্চদশ শতকের লেখকদের পক্ষে লাতিন ও ইতালীয় ভাষা এনক্রিপ্ট বা গোপন করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা ছিল ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। নাইব সাইফার মূলত একটি ‘হোমোফোনিক সাবস্টিটিউশন সাইফার’। অর্থাৎ, এতে একটি বর্ণকে বোঝাতে একাধিক প্রতীক ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া পঞ্চদশ শতকের সাধারণ লেখার উপকরণ ব্যবহার করে এটি হাতে লেখা সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, নাইব সাইফারের মাধ্যমে তৈরি শব্দগুলোর গঠনশৈলী এবং ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির শব্দগুলোর পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে বিস্ময়কর মিল রয়েছে। ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো- এর কিছু নির্দিষ্ট প্রতীক বা অক্ষর কেবল শব্দের শুরুতে বসে, কিছু অক্ষর শব্দের মাঝখানে এবং কিছু অক্ষর কেবল শব্দের শেষে দেখা যায়।
গ্রেশকো তার তৈরি সাইফারে ঠিক একই নিয়ম প্রয়োগ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে যদি কোনো সাধারণ ভাষাকে সংকেতে রূপান্তর করা হয়, তবে তা ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির মতোই দেখায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘এই পদ্ধতিতে তৈরি সাইফারটেক্সট বা সাংকেতিক লিপিগুলো সম্পূর্ণ পাঠযোগ্য। একই সঙ্গে তা ভয়নিচ পাণ্ডুলিপির অনেক গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত বৈশিষ্ট্য হুবহু নকল করতে সক্ষম।’
যেহেতু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তৈরি এই ‘কৃত্রিম’ শব্দগুলোর সঙ্গে আসল পাণ্ডুলিপির কাঠামোগত মিল পাওয়া যাচ্ছে। তাই গবেষকের ধারণা, ভয়নিচ পাণ্ডুলিপি অর্থহীন কোনো আঁকিবুঁকি নয়। বরং এতে প্রকৃত শব্দই বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এই গবেষণাটি সেই সব বিজ্ঞানীর দাবিকে আরও জোরালো করল, যারা বিশ্বাস করেন এটি একটি সাইফারটেক্সট। বিজ্ঞানীদের আশা, কম্পিউটার অ্যালগরিদম ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ৬০০ বছরের পুরোনো রহস্যের জট হয়তো শিগগির পুরোপুরি খোলা সম্ভব হবে।


