একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের দ্বাদশ দিন আজ (১২ মার্চ)। কবি সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে সারা আলীর তোপখানা রোডের বাসায় অনুষ্ঠিত মহিলা পরিষদের সভায় পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানানো হয়। লন্ডনের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এদিন এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বল প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক। কিন্তু শক্তি প্রয়োগ নিষ্ফল ও বিপজ্জনক হবে।
এদিকে বাঙালির তীব্র অসহযোগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠেয় সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজ, খেতাব প্রদানসহ পূর্বনির্ধারিত সব অনুষ্ঠান বাতিল ঘোষণা করা হয়। আওয়ামী লীগের নেতা এম মনসুর আলী এদিন পূর্ব পাকিস্তানের উদ্দেশে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যবোঝাই জাহাজটির গতিপথ চট্টগ্রামের বদলে করাচির দিকে পাঠানোয় গভীর উৎকণ্ঠা ও নিন্দা জানান। মওলানা ভাসানী ময়মনসিংহের একটি জনসভায় আওয়ামী লীগের পক্ষে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে উর্দুভাষী পাকিস্তানি শাসকরা আলোচনার নামে তাদের নৃশংস ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখেন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে পাকিস্তানিদের শেষ মুহূর্তের ষড়যন্ত্রের উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১২ মার্চ রাওয়ালপিন্ডি থেকে একজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা ঢাকায় এসে তাজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে চান। কামাল হোসেন বিষয়টি শেখ মুজিবকে জানালে তিনি কামাল হোসেনকে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে বলেন। কর্মকর্তাটি বলেন, ইয়াহিয়া যদি ঢাকা আসেন তাহলে মুজিব তার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট হাউসে দেখা করবেন কি না। এ প্রশ্ন তিনি করছেন, কারণ এর আগে মুজিব গভর্নর হাউসে গিয়ে টিক্কা খানের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করেছিলেন। এটি পরিষ্কার হওয়া দরকার। মুজিব ইয়াহিয়াকে তার বাসায় আসতে বলবেন কি না। কামাল হোসেন বিষয়টি শেখ মুজিবকে জানালে মুজিব বলেন, তিনি ইয়াহিয়ার সঙ্গে তার পছন্দমতো জায়গায় দেখা করবেন, সেটি প্রেসিডেন্ট হাউসও হতে পারে। তবে তিনি যদি তার বাসায় আসেন তাকে স্বাগত জানানো হবে।’
কবি সুফিয়া কামালও ১২ মার্চ ডায়েরিতে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কার কথা লিখেন। ‘একাত্তরের ডায়েরি’ গ্রন্থে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে- ‘রাত ৯টা: কাল গেল বসন্ত পূর্ণিমা। বড় সুন্দর রাত। কিন্তু বড় যন্ত্রণায় রাত কাটল। মানুষের দেহ কারাগারে বন্দি, আত্মার ক্রন্দনে সীমা নেই। গুমরে গুমরে কাঁদে সে মুক্তির জন্য, সুন্দরে বিলীন হওয়ার জন্য। সংসার যে কত কঠোর! বেঁচে থাকার যে কত মাশুল দিতে হয়!’ কবি আরও লিখেন, ‘ঢাকার অবস্থা স্বাভাবিক। মিছিল চলছে সারা দিন রাত। কিন্তু এই স্বাভাবিকতাই এখন এত অস্বাভাবিক লাগছে। ঝড়ের আগের স্তব্ধতা নয়তো? টিক্কা খান এত লাঞ্ছনা অপমান নির্বিকারে সহ্য করে যাচ্ছে,আশ্চর্য।’
এদিন বগুড়া জেলখানা ভেঙে ২৭ জন কয়েদি পালিয়ে যান। কারারক্ষীদের গুলিতে ১ কয়েদি নিহত ও ১৫ জন আহত হন। অব্যাহত আন্দোলনে সরকারি-আধাসরকারি অফিসের কর্মচারীরা কর্মস্থল বর্জন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তালা, সরকারি ও বেসরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাসগৃহ ও যানবাহনে কালো পতাকা উড়তে থাকে।
জাতীয় পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ জহিরউদ্দিন পাকিস্তান সরকারের দেওয়া খেতাব বর্জন করেন। পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্র প্রদর্শকরা বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে অনির্দিষ্টকাল প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তারা আওয়ামী লীগের সাহায্য তহবিলে ১৩ হাজার ২৫০ টাকা অনুদান দেন।
ময়মনসিংহে এক জনসভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি শেখ মুজিবুর রহমান কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন না। আপনারা শেখ মুজিবের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখুন।’
ওই দিনও ডায়েরি লিখেন শহিদ জননী জাহানারা ইমাম। ডায়েরিতে তিনি বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের যৌক্তিকতা সম্পর্কে লিখেন। শহিদ জননীর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, ‘কিটিকে নিয়ে মহা ঝামেলায় পড়েছি। তার জন্য এই বুড়ো বয়সে নতুন করে সাধারণ জ্ঞানের বই পড়ে তথ্য জোগাড় করতে হচ্ছে। এত মিটিং, মিছিল, বিক্ষোভ দেখেও সে যেন মেনে নিতে পারছে না পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের এই বিক্ষোভ ন্যায়সংগত, তাদের স্বাধিকারের দাবি ন্যায়সংগত। কিটি বলছে, তোমরা তো খালি মুখেই বলছো তোমরা বঞ্চিত, পশ্চিম পাকিস্তান তোমাদের প্রতি অন্যায় করছে, তোমাদের টাকা দিয়ে নিজেদের পেট ভরাচ্ছে। কিন্তু এ অভিযোগের সমর্থনে ফ্যাক্টস কই? ফিগার্স কই? কোন কোন খাতে তোমরা বঞ্চিত-শোষিত, তার স্ট্যাটিসটিক্স দেখাও। শোনো কথা! শোষণ, বঞ্চনার পরিসংখ্যান আমি মুখস্থ করে রেখেছি নাকি? কিন্তু কিটিকে তো আর বলতে পারিনে, আমার অত মনে নেই, তুমি বই-কাগজপত্র পড়ে নিজে জেনে নাও। সুতরাং আবার নতুন করে গত চব্বিশ বছরের অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ, অবিচারের পরিস্যংখ্যান ঘাঁটছি। পাই-পয়সা ধরে হিসাব করে কিটিকে দেখিয়ে দেব- চাল, আটা, নুন, কাগজ, সোনা থেকে শুরু করে সব খাতে কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে শুঁষে ছিবড়ে করে দিচ্ছে। শেখের নির্বাচনি পোস্টার ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ খুঁজে বেড়াচ্ছি। ওটা কিটিকে দেখাতে পারলেই আমার কাজ বারো আনা হাসিল হয়। ওতে পাই-পয়সা ধরে হিসাব করে বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে বৈষম্য ও শোষণের সব তথ্য। কিন্তু কারও কাছে যদি এক কপি থেকে থাকে।’