অগ্নিঝরা মার্চের আজ ত্রয়োদশ দিন। ১৯৭১ সালের এই দিন পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ সামরিক আদেশ জারি করে। এই আদেশে ১৫ মার্চ সকাল ১০টার মধ্যে প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। সামরিক নির্দেশে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজে যোগদানে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের চাকরিচ্যুত ও পলাতক ঘোষণা করে সামরিক আদালতে বিচার করা হবে। নির্দেশ অমান্যকারীদের সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হবে বলে ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়।
পাকিস্তানের উর্দুভাষী শাসকগোষ্ঠীর এই সামরিক নির্দেশ জারির পর পরই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, আওয়ামী লীগপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘যখন আমরা সামরিক শাসন প্রত্যাহারের জন্য বাংলার জনগণের প্রচণ্ড দাবির কথা ঘোষণা করেছি, ঠিক তখন নতুন করে এ ধরনের সামরিক নির্দেশ জারি পক্ষান্তরে জনসাধারণকে উসকানি দেওয়ার শামিল।’
উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ন্যাপের সভাপতি ওয়ালী খান ও দলটির আরেক নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জো সকালে করাচি থেকে বিমানে করে ঢাকায় আসেন। তবে এদিন পশ্চিম জার্মানির ৬০ জন, জাতিসংঘের ৪৫ জন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও ফ্রান্সের ৪০ জনসহ মোট ২৬৫ বিদেশিকে বিশেষ বিমানে ঢাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঢাকা বিমানবন্দরে ন্যাপপ্রধান ওয়ালী খান বলেন, ‘বর্তমান সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য আমি খোলা মনে ঢাকায় এসেছি। সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে আমি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একমত।’
এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের পিপিপি ও কাইয়ুমপন্থি মুসলিম লীগ ছাড়া সব বিরোধী দলের নেতারা দেশের অনিবার্য ভাঙন রোধে জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে অবিলম্বে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। বৈঠকে কাউন্সিল মুসলিম লীগ, কনভেনশন লীগ, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, জমিয়তে ওলামায়ে পাকিস্তানের নেতারা অংশ নেন। ওয়ালী ন্যাপ আগেই শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল।
বিকেলে চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ নগরীর লালদীঘি ময়দানে জনসভা করে। জনসভায় নেতারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে অসহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। চট্টগ্রামে বেগম উমরতুল ফজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নারীদের সমাবেশে বাংলাদেশের জনগণের পরিপূর্ণ মুক্তি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত বিলাসদ্রব্য বর্জন ও কালো ব্যাজ ধারণের জন্য নারী-পুরুষ সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
এদিন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ও সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল হাকিম পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত খেতাব এবং পদক বর্জন করেন। সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য আফাজউদ্দিন ফকির এক বিবৃতিতে ‘লেটার অব অথরিটি’ দ্বারা ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। তিনি পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষা বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব একজন বাঙালি জেনারেলের কাছে অবিলম্বে হস্তান্তর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের সব কটি ব্যাটালিয়নের পরিচালনা কর্তৃত্ব বাঙালি অফিসারদের হাতে অর্পণ এবং বিগত এক মাসে পূর্ব বাংলায় যে অতিরিক্ত পাকিস্তানি সৈন্য আনা হয়েছে, তাদের প্রত্যাহারের দাবি জানান।
প্রতিদিনের মতো এদিনও অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) রাজধানী ঢাকাসহ প্রদেশের বড় শহরগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মিছিল-সমাবেশে মুখরিত ছিল। ঢাকায় সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে বিশাল মশাল মিছিল বের করে ছাত্র ইউনিয়ন।
ওই দিন সম্পর্কে স্মৃতিচারণা রয়েছে কবি সুফিয়া কামালের। তার ‘একাত্তরের ডায়েরী’ গ্রন্থে ১৩ মার্চের বর্ণনা রয়েছে এভাবে, ‘রাত ১১টা: পথ সভা আর পথ সভা। সারা দিন চলছে মিটিং মিছিল। আজ ইয়াহিয়া মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা আসছেন। রাত ৮টায় ঘোষণা হলো ১৪৪ ধারা। সামরিক কর্মচারীরা সোমবার থেকে কাজে যোগদান না করলে ১০ বৎসর কারাদণ্ড হবে। বিবিসি থেকে নাকি প্রচার হয়েছে, মুজিবুর রহমান যেন ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা না করে, বামপন্থী ছাত্ররা আপত্তি তুলেছে।
আজ সারা দিন ব্যর্থ গেল। কী জানি একটা আশা ছিল মনে, সেটা হলো না। যে আসবার সে আসেনি।’