মুক্তিযুদ্ধের আগেই ঢাকা থেকে আমি বরিশাল মেডিকেল কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলাম। বরিশাল শহরের পেশকার বাড়িতে আমার চেম্বার এবং আমার স্বামী এমএনএ নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের চেম্বার দুটোই মুক্তিযুদ্ধের কন্ট্রোলরুম হিসেবে ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিই।
৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, প্রতি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে, তোমাদের যার যা কিছু আছে তা দিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’- শোনার পর থেকেই আমরা নিজেদের তৈরি করতে থাকি।
২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আমরা আমাদের বাসার সামনে গণসংগীতের মঞ্চে গণসংগীত শুনছিলাম। রাত ১১টার দিকে ঢাকা থেকে ছাত্রনেতা খালেদ জানায়, ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক নেমেছে। পাক সামরিক বাহিনী শহরে নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে। আমরা তাৎক্ষণিক সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ি। আমার স্বামী নুরুল ইসলাম মঞ্জুর সাহেব টেলিফোনে সবাইকে খবর দিয়ে মিটিংয়ে আসতে বলছেন। বাসার কন্ট্রোলরুমে একে একে সব এমপি, এমএনএ ও সব দলের প্রধান এবং ডিসি ও এসপি সাহেব সমবেত হলেন। আগেই পহেলা মার্চ পূর্বানীর জলসা ঘরের মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন পাক আর্মি আক্রমণ করলে স্থানীয় এমএনএ ও এমপিদের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নিতে হবে ও শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। সে অনুযায়ী মঞ্জুর সাহেবসহ অন্যরা মিলে তাৎক্ষণিক একটি কমিটি গঠন করলেন। মিটিং চলল ভোররাত পর্যন্ত। সেই থেকে বরিশালে মুক্তিযুদ্ধ চলল ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। ২৫ এপ্রিল বরিশাল দখল করে নেয় পাক বাহিনী।
২৬ এপ্রিল আমরা পরিবারসহ কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ছোট্ট একটি লঞ্চে ঝালকাঠির দিকে রওনা হই। একটি গানবোট আমাদের সামনে এসে পড়ে। লঞ্চে আমরা মহিলারা সবাই বোরকা পরে নেই। বাচ্চারা কান্নাকাটি শুরু করে। আমরা সেখান থেকে ভারতের হাসনাবাদের উদ্দেশে রওনা করি এবং ৬দিন পরে সেখানে পৌঁছাই। মঞ্জুর সাহেব আমাদের থেকে ভিন্ন হয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ভারতে চলে যান আগে। হাসনাবাদে আমরা এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের বাড়িতে আশ্রয় পাই। আমি এমবিবিএস ডাক্তার জানার পরে বিভিন্ন জায়গা থেকে অসুস্থ ও আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসতে শুরু করেন। ভিড় এত বেড়ে যায় যে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সামাল দেওয়া অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরে আমাকে টাকি হেলথ সেন্টারের জন্য মেডিকেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সেখানে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসা নিতে থাকেন। এমনকি মাঝে মাঝে ছেলেদের ক্যাম্পে ও শরণার্থী শিবিরেও যেতে হয়েছিল আমাকে। অনেক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তমাখা ছিন্নভিন্ন শরীর দেখে কান্না আসত। তবু মন শক্ত করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতাম। তারা সুস্থ হয়ে অনেকে আবার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেলেন।