আগামীকাল ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। বিজয় দিবসের আগেই বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা মুক্ত হতে থাকে। তবে সিলেটমুক্ত দিবস নিয়ে ৫৩ বছরেও কাটেনি বিভ্রান্তি। এমনকি বেশ কয়েক বছর ধরে ১৫ ডিসেম্বর সিলেটমুক্ত দিবস বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সিলেট ১৭ ডিসেম্বর পাকস্তানি হানাদারমুক্ত হয়। সিলেটের বিমানবন্দর এলাকায় যুদ্ধ করা তৎকালীন প্লাটুন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ভবতোষ রায় বর্মণ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সিলেট মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ভবতোষ রায় বর্মণ ১৯৭১ সালে সরকারি চাকরি করতেন। ১৭ এপ্রিল যখন অস্থায়ী সরকার গঠন হলো, তখন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ‘ইকো-১’-এ তিনি ৩৭ দিন প্রশিক্ষণ নেন। তামাবিল এলাকায় কোম্পানি কমান্ডার রফিকুল আলমের অধীনে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেন তিনি।
সিলেট মুক্ত দিবস নিয়ে খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর সিলেট শাহজালাল বিমানবন্দরে উত্তরের দিকে কচুয়ারপারে আমিসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে ঘেরাও করে রেখেছিলাম। সেদিন সকাল ১০টার দিকে আমাদের কাছে খবর এল, পাকিস্তানি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসর্মপণ করেছে।
এই খবর শুনে আমরা সবাই যে যার মতো বাঁধভাঙা উল্লাস করি। এভাবেই আমাদের সারা দিন চলে যায়। তবে মাগরিবের আজানের সময় হঠাৎ বিমানবন্দরের এক প্রান্ত থেকে পাকিস্তানিরা মুহুর্মুহু গুলি করতে থাকে। সেদিন কয়েক ঘণ্টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আনুমানিক ১০ হাজার গুলি ছুড়েছে।
বিজয় হয়ে গেছে শোনার পর ১৬ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানিদের এই গোলাবর্ষণ দেখে সব মুক্তিযোদ্ধা অবাক হয়েছিলাম। ৭ মাস ২২ দিন আমি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করি। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টায় যে পরিমাণ গুলাগুলি চলেছে, সেটা আমি ৭ মাসের যুদ্ধেও দেখিনি। তাই বলা যেতে পারে, ১৬ ডিসেম্বরও আমরা যুদ্ধ করেছি। ১৭ ডিসেম্বর থেকে সিলেটে পাকিস্তানি বাহিনী একটি বুলেটও চালায়নি। আমরা যারা প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে ছিলাম, তারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সিলেট ১৭ ডিসেম্বরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীমুক্ত হয়।’
ভবতোষ রায় বর্মণ বলেন, ‘১৩ ডিসেম্বর সিলেটে পাকিস্তানিদের সঙ্গে কদমতলীতে ভীষণ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানিরা টিকতে পারেনি। কেননা তখন পশ্চিম দিক থেকে সুনামগঞ্জের একটি দল সিলেট শহরের দিকে যুদ্ধ করে এগিয়ে আসছিল।
তখন পাকিস্তানিরা ভাবতে লাগল, শহরে যদি মুক্তিযোদ্ধারা ব্লক করে দেয়, তাহলে তারা বিমানবন্দরে যেতে পারবে না। তখন পাকিস্তানিরা তাড়াহুড়ো করে তৎকালীন কেটেল পার্ক, বর্তমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আত্মরক্ষার জন্য এম্বুস নিয়ে বসেছিল। প্রায় বেশির ভাগ পাকিস্তানি সেনা তখন বিমানবন্দরে গিয়ে জড়ো হয়।
এভাবে দুই দিন চলে যায়। এরপর সিলেট শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর তৎপরতা কমে যায়। তবে বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্নভাবে কিছু পাকিস্তানি বিমানবন্দরে যেতে চাইলে স্থানীয় এলাকাবাসী ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আটক করে।’
সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের মূল ইতিহাস উদঘাটনের আহ্বান জানিয়ে ভবতোষ রায় বর্মণ বলেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং সামগ্রিকভাবে কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরই আমাদের মহান বিজয় দিবস। এই দিনেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসর্মপণ করেছিল। তবে এর আগেই বিভিন্ন জেলা উপজেলা পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয় এবং সেটা স্থানীয়ভাবে দিবস হিসেবে পালনও হয়। কিন্তু সিলেটমুক্ত দিবস ওইভাবে পালন হয় না। কারণ আমরা ১৬ তারিখের পর মুক্ত হওয়ায় সিলেটমুক্ত দিবস সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
আমরা চাই সিলেটমুক্ত দিবসটিও যেন ইতিহাস রক্ষার স্বার্থে পালন করা হয়।’