আঁকাবাঁকা হাওরে চলার মেঠোপথ। পথের দুই পাশে পানি। এক টুকরো এক টুকরো জায়গায় শতাধিক গরুর অবাধ বিচরণ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ এমন এক দৃশ্যের দেখা মেলে মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার কাউয়াদিঘির হওরাঞ্চলের রসুলপুর গ্রামে।
এ গ্রাম থেকে একটি বড় উঁচু রাস্তা চলে গেছে হাওরের প্রান্তজুড়ে। বর্ষায় যখন চারপাশ পানিতে একাকার হয়ে যায়, তখন এ পথের ওপর গবাদিপশুর বিচরণ এক অপূর্ব দৃশ্য। এখানকার প্রকৃতি আর গবাদিপশুর সহাবস্থান যেন সৌন্দর্যের এক গল্প।
গত রবিবার সকালে সদর উপজেলার রসুলপুর গ্রাম দিয়ে কাউয়াদিঘি হাওরে যাওয়ার রাস্তায় দেখা গেছে, শতাধিক গরু-মহিষ ও ছাগল রাস্তাজুড়ে বিচরণ করছে। এখন হাওরপাড়ে বিভিন্ন জাতের ঘাস বেড়ে উঠেছে, গবাদিপশু সেই ঘাস খেয়ে দিন পার করছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরো আর আমন ধান চাষ, মাছ শিকারের পাশাপাশি গবাদিপশুর লালন-পালনে ঝুঁকছেন তারা। হাওরাঞ্চলে গরুর সংখ্যা কমতে থাকলেও দুই-তিন বছর ধরে গরুর সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে। এখানকার প্রতিটি বাড়িতেই গবাদিপশু পালন করা হয়। গৃহস্থরা হাওরের পতিত জমিতে ঘাস খাওয়ানোর জন্য গবাদিপশু পাঠিয়ে দেন। শুকনো মৌসুমে ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত হাওর এলাকায় গবাদিপশুর ছোট-বড় পালের দেখা মেলে এখানে। তবে বর্তমানে বর্ষায় হাওড়পাড়ের উঁচু জায়গায় কিছু গবাদিপশু দেখা যায়।
রসুলপুর গ্রামের কৃষক জয়নাল মিয়া বলেন, ‘এ রাস্তার চার-পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে গ্রামের গৃহস্থরা গরু-মহিষ চড়ান। প্রতিদিন সকালে এখানে গরু, ছাগল ও মহিষ নিয়ে আসেন। সারা দিন গরু-মহিষের দল রাস্তায় ঘাস খায়, ঘুরে বেড়ায়, সন্ধ্যার আগে আগে দলবেঁধে আবার গৃহস্থের ঘরে ফিরে আসে।’
রাখাল আব্দুল খালেক বলেন, ‘এ উঁচু রাস্তাটিই গরু-ছাগলের ভরসা। বর্ষায় যেখানে চারদিকে পানি, সেখানে এ জায়গায় গরু রাখলে আমাদের অনেক উপকার হয়। গবাদিপশুকে খাওয়াতে পারি।’
আরেক রাখাল রাসেল মিয়া বলেন, ‘হাওরপাড়ে থাকি, দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। নিজের জমি নেই। চাষ করতে পারি না ঠিকই, তবে গরুগুলো আছে বলে টিকে আছি। গরু আর এই একটু উঁচু জমি- এ দুই-ই এখন জীবনের বড় সম্বল।’
কৃষক শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘গরুগুলা আমাদের সম্পদ। জমি চাষ হোক বা না হোক, গরুর দুধ বিক্রি করে সংসার চালাই। তাই এ উঁচু জায়গায় গরু নিয়ে আসি, তাদের খাবার খাওয়াতে।’ গবাদিপশু চড়াতে ব্যস্ত রসুলপুর এলাকার কৃষক জুবায়ের মিয়া। তিনি বলেন, ‘আজ আমার দায়িত্ব পড়েছে গরু চড়ানোর। নিজের ৩টি গরুসহ মোট ১৭টি গরু নিয়ে এখানে এসেছি।’
কৃষক মন্নান মিয়া বলেন, ‘আমার ৮টি গরু আছে। কৃষিকাজ করার পাশাপাশি এগুলো লালন-পালন করি। জমিতে এখন পানি থাকায় ঘাসের অনেক অভাব।’ গরুর একটি বড় পাল সামলাচ্ছেন রাখাল যথী দাশ। তিনি বলেন, ‘সকালে গবাদিপশু নিয়ে এখানে এসেছি। এখন চারদিকে থইথই পানি। গরু-ছাগলের খাবার জোগান দিতে কষ্ট হচ্ছে।
সদর উপজেলার কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে কাজ করেন আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, ‘শীত-বর্ষায় হাওরে দুই রকমের জীবন। শীতে সব শুকনো থাকলেও বর্ষায় পানিতে সব তলিয়ে যায়। এ সময় গবাদিপশু একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে কচুরিপানা খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আর শুষ্ক মৌসুমে হাওরের উন্মুক্ত জায়গায় গবাদিপশুর বিচরণ করিয়ে লালন পালন করা হয়।’
