এ বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর গিয়েছিলাম সুন্দরবন। বাঘের সাম্রাজ্য শেখেরটেক দিয়ে পাখি-প্রাণী দেখা শুরু হলো। শেখেরটেকে এক রাত থেকে দুটি বিরল প্রজাতির পাখির ছবি তুলে আন্ধারমানিকের উদ্দেশে রওনা হলাম। কিন্তু ওখানে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে যাওয়ায় তেমন কোনো পাখি-প্রাণীর দেখা পেলাম না। এরপর আমাদের ছোট্ট লঞ্চ ‘সি-গাল’ কটকার দিকে ছুটল, কিন্তু রাতের আগে ওখানে পৌঁছাতে পারলাম না। পরদিন খুব ভোরে লঞ্চ থেকে ছোট্ট ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে কটকা, জামতলী ও সাপের খালে অভিযান চালালাম। বিভিন্ন প্রজাতির মাছরাঙাসহ অন্যান্য পাখির দেখা পেলেও নতুন কিছু পেলাম না। এরপর বাঘের বৈঠকখানাখ্যাত কটকা টাওয়ার এলাকায় এসে সুন্দরী বায়স (Sunderban Cro), শ্বেত শার্দুল (White Tiger), নীল পুনম (Great Eggfly), সিঁদুরী পদ্মরাগসহ (Crimson Rose) বেশ কিছু প্রজাপতি দেখলাম।
দুপুরে কটকা থেকে ছুটা কটকা খাল হয়ে কচিখালী এসে প্রথমেই ডিমের চরের খালে ঢুকলাম। খালের দুপাড়ে বাবুই পাখির বিশাল কলোনি। এত বড় কলোনি সুন্দরবন কেন, দেশের কোথাও আর নেই। ওদের ছবি তুলে নৌকা থেকে চরে নামলাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর বঙ্গপোসাগরের পাড়ে এসে বিরল বিলচোরা বা গঙ্গাতিতাই (Great Thick Knee) পাখির দেখা পেলাম। বিকেলে কচিখালী খালে বিরল বেলাই ভুতুম প্যাঁচার (Buffy Fish Owl) খোঁজে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরতে হলো। রাতে সুন্দরবন ভ্রমণের শেষ গন্তব্য করমজলের উদ্দেশে রওনা হলাম। ভোরে করমজল পৌঁছে পুরো বন একবার চক্কর দিলাম। তবে একটি রাজগোখরার ছানা ছাড়া তেমন কোনো পাখি-প্রাণীর দেখা পেলাম না। করমজল সাধারণত এমন হতাশ করে না কখনো।
একসময়ে দর্শনার্থীরা সারা বছর সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাস সুন্দরবনের সব ধরনের ভ্রমণ বন্ধ রাখা হচ্ছে, যাতে পাখি-প্রাণীরা নিবিড়ভাবে প্রজনন করতে পারে। তাই ভেবেছিলাম চার মাস বন্ধ থাকার পর যখন সুন্দরবন যাব, প্রচুর পাখি-প্রাণীর দেখা পাব। সে কারণেই সেপ্টেম্বরে গেলাম। কিন্তু আমাদের সে আশার গুড়ে বালি। তেমন কোনো পাখি ও প্রাণী চোখে পড়ল না। এত কম পাখি-প্রাণী কোনোদিনও সুন্দরবনে দেখিনি। এর সঠিক কারণ বুঝতে পারলাম না।
যাহোক, সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ করমজলের কুমির প্রজনন কেন্দ্র পেরিয়ে কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রের দিকে গেলাম মহাবিপন্ন বড় কাইট্টা (River ev Mangrove Terrapin) দেখার জন্য। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটিকে পাড়ে উঠতে দেখলাম। দ্রুত ওর ছবি তুললাম। কচ্ছপের ছবি তুলে সামনে এগিয়ে যেতেই একটি গাছের পাতায় একজোড়া প্রজাপতিকে প্রজননরত অবস্থায় দেখলাম। দুর্লভ এই পতঙ্গটিকে এর আগে শুধু সিলেটের টিলাগড় ইকোপার্কে দেখেছিলাম বছর দশেক আগে। তবে গত ২৮ নভেম্বর প্রজাপতিটির সঙ্গে আবারও দেখা হলো মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মাধবকুণ্ড ইকোপার্কের জলপ্রপাতের কাছে। একটি পাথরের ওপর বসে ছিল সে। প্রথম দেখায় চিনতে না পারলেও ভালো করে খেয়াল করতেই চিনে ফেললাম। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে দ্রুত ওর ছবি তুললাম।
সুন্দরবনের করমজল ও মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ডে দেখা পতঙ্গটি এ দেশের দুর্লভ ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতি দেতাবকী। পশ্চিমবঙ্গে বলে বাতাসি। ইংরেজি নাম Chestnut-streaked Sailor। নিম্ফালিডি গোত্রের পতঙ্গটির বৈজ্ঞানিক নাম Neptis jumbah (নেপটিস জুমবাহ)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমারসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা মেলে।
দেতাবকীর আকার মাঝারি। প্রাপ্তবয়স্ক প্রজাপতির ডানার বিস্তার ৬০ থেকে ৭০ মিলিমিটার। এক নজরে এটি কালচে বা গাঢ় বাদামির ওপর সাদা রেখার প্রজাপতি। সামনের ডানার ওপরে খোপে পক্ষমূলীয় সাদা দাগ ও বাইরে একটি ফুটকি থাকে। মাঝ আঁচলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঘরের ফুটকি পঞ্চম ঘরের সঙ্গে একই রেখায় থাকে। পেছনের ডানার উপরাংশে বার-আঁচলে সাদা ফুটকির সারি নেই। স্ত্রী প্রজাপতির সামনের ডানার ফুটকি ও পেছনের ডানার গোড়ার নিচের ফিতে বেশি চওড়া।
এটি সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের বাসিন্দা। মূলত প্রাথমিক ও গৌণ বনাঞ্চলে বাস করে। রোদেলা ফাঁকা জায়গা ও বনের প্রান্তে বেশি দেখা যায়। দৃঢ়ভাবে ওড়ে। ওড়ার সময় অনেকটা হাওয়ার ওপর ভর করে ধীরগতিতে ভেসে বেড়ায় ও মাঝে মাঝে হঠাৎ করে ডানা ঝাপটায়। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি ফুলের রস পান করে; তবে পুরুষগুলো মাঝে মাঝে ভেজা মাটি থেকে লবণ ও পানি সংগ্রহ করে।
জীবনচক্র শিমুল তুলা, পারিজাত মান্দার, করঞ্জ, জবা, পরশ পিপুল প্রভৃতি পোষক গাছে সম্পন্ন হয়। স্ত্রী পোষক গাছের পাতায় বাদামি-বেগুনি রঙের কিছুটা টাকু আকৃতির ডিম পাড়ে। ডিমের গায়ে ছয়কোনা নকশার উঁচু রেখা ও ছোট ছোট কাঁটার মতো থাকে। ডিম ফুটে দুই শিংওয়ালা শূককীট বা ছানা বের হয়। শূককীট গাছের পাতা খেয়ে ও বেশ কয়েকবার খোলস পাল্টে দ্রুত বড় হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি শুকনো প্যাঁচানো পাতার ভেতর লুকিয়ে থাকে ও মাঝে মাঝে বাইরে বেরিয়ে খাবার খায়। এরপর এটি নিজেকে পোষক গাছের ডালে বা পাতায় শক্ত খোলসে আবৃত করে ফেলে মূককীটে পরিণত হয়। মূককীট বা গুটি দেখতে কতকটা শুকনো পাতার মতো। একসময় মূককীটের খোলস কেটে পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি বেরিয়ে আসে। দেতাবকীর জীবনচক্রের চারটি পর্ব (যেমন- ডিম, শূককীট, মূককীট ও পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি) সম্পন্ন হতে ২১ থেকে ৩২ দিন সময় লাগে। তবে পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির আয়ু মাত্র ৭ থেকে ১৪ দিন।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
