রাজধানীর কমলাপুর স্টেশন এলাকায় আন্তনগর ট্রেন পঞ্চগড় এক্সপ্রেস (৭৯৩) লাইনচ্যুতির ঘটনায় ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে।
শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) সকাল থেকে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া সব ট্রেনেরই শিডিউল বিপর্যয় ঘটে। এতে যাত্রীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্টেশনে তাদের বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ট্রেনটি উদ্ধারে লেগে যায় প্রায় সাত ঘণ্টা। এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ তিনটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করেছে।
এদিকে শুক্রবার দুপুরে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে যাত্রীদের তোপের মুখে পড়েন রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) সরদার সাহাদাত আলী। ট্রেনের যাত্রা বাতিল করে অনেক যাত্রী ভিড় করেন স্টেশন ব্যবস্থাপক মাসুদ সারওয়ারের কক্ষে। তারা টিকিটের টাকা ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে পঞ্চগড়গামী ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয় কমলাপুর স্টেশনের আউটার সিগন্যাল এলাকায়। এ ঘটনায় সকালে কমলাপুরে ঢোকার ট্রেনগুলো আটকা পড়ে বিভিন্ন স্টেশনে। সেগুলো গাজীপুরের জয়দেবপুর, পুবাইল, টঙ্গী, নরসিংদীর জিনারদী, ঘোড়াশাল, ঢাকার বিমানবন্দর, তেজগাঁও ও ক্যান্টনমেন্টে স্টেশনে আটকে থাকে দিনভর। ওই ট্রেনগুলো ঢুকতে না পারায় ঢাকা থেকে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের রুটের সব কটি ট্রেন প্রায় ৫-৭ ঘণ্টা বিরতিতে কমলাপুর থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লোকাল ট্রেন গোপীবাগে লাইনচ্যুত হয়। দুটি লাইনচ্যুতির ঘটনা ট্রেনের শিডিউলকে একেবারেই এলোমেলো করে ফেলে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ড্যাশবোর্ড থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামগামী মহানগর গোধূলী সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের স্থলে ছেড়েছে বেলা ৩টায়। লালমনিরহাটগামী বুড়িমারী এক্সপ্রেস সকাল সাড়ে ৮টার স্থলে ছেড়েছে বেলা সাড়ে ৩টায়। রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ১০ মিনিটের স্থলে ছেড়েছে বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে। পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস সকাল সোয়া ১০টার স্থলে বেলা সোয়া ২টায়, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস বেলা সোয়া ১১টার স্থলে বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে, সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটের স্থলে ছেড়েছে বেলা ২টা ৫২ মিনিটে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী সোনার বাংলা, কিশোরগঞ্জগামী এগারসিন্দুর প্রভাতী, দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ও মোহনগঞ্জগামী মহুয়া কমিউটার, চিলাহাটীগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা দেরিতে কমলাপুর ছেড়েছে।
কমলাপুর স্টেশন মাস্টার আনোয়ার হোসেন জানান, শিডিউল বিপর্যয়ের দিনে কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস সকাল ১০টা ২০ মিনিটে, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। ট্রেনগুলোর যাত্রা বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েন যাত্রীরা। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়। তবে কোনো বগি উল্টে যায়নি। কেউ হতাহতও হননি। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লোকাল ট্রেন গোপীবাগে লাইনচ্যুত হয়। সে সময় ঢাকা-খুলনা লাইনে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
কমলাপুর স্টেশনের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে থেকে আসা রংপুর এক্সপ্রেস ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে, বুড়িমারী এক্সপ্রেস বিমানবন্দর স্টেশনে, উপবন ও একতা টঙ্গী জংশনে, উপকূল এক্সপ্রেস নরসিংদীতে, সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও এগারসিন্দুর প্রভাতী জিনারদী স্টেশনে আটকে পড়ে গতকাল দুপুরে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি সাধারণ সময়ের প্রায় আধা ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ছাড়ে। প্ল্যাটফর্ম পার হওয়ার ২ মিনিটের মধ্যে ঝাঁকুনি অনুভব হয় এবং ট্রেনটি থামানো হয়। পরে নেমে দেখা যায় ট্রেনের ৬টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। লাইনের পাত ভেঙে গেছে। পরে চাকাগুলো নিচে পড়ে যায়। ট্রেনের গতি কম ছিল বলে কেউ আহত হননি।
দিনভর দুর্ভোগ
রেলের শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনায় ঢাকার কমলাপুর, বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে দিনভর দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন যাত্রীরা। রেলসেবা-সংক্রান্ত বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে তারা ট্রেনের আপডেট জানতে পোস্ট করেছেন একাধিকবার। কমলাপুর থেকে কখন ট্রেন ছাড়বে, কোন ট্রেন কোন স্টেশনে আটকে আছে- এসব তথ্যও জানিয়েছেন যাত্রীদের অনেকে। ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কথা হয় কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের যাত্রী নাজমুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি বাসা থেকে খবর শুনে বের হয়েছি যে লাইনচ্যুত হওয়া ট্রেনটি উদ্ধার করা হয়েছে। রেল চলাচল স্বাভাবিক। স্টেশনে এসে জানতে পারলাম ট্রেনটি যাত্রা করবে না। কাউন্টারে টিকিটের টাকা রিফান্ডের জন্য গেলাম। আমাকে হতাশ হতে হলো। এখন সেই মহাখালী যেতে হবে বাড়ি যাওয়ার বাস পেতে।’
চট্টগ্রামগামী সোনার বাংলা এক্সপ্রেসের যাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসী জানান, ট্রেনের জন্য ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষা করে অসুস্থ মাকে নিয়ে তিনি বাসেই রওনা হয়েছেন। বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে গণমাধ্যমকর্মী মনোয়ার হোসেন জানান, সিলেটগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি। শিডিউল বিপর্যয়ে উপায়ান্তর না দেখে তিনি মতিঝিলে এসে কুলাউড়াগামী বাসে ওঠেন। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকার কাঁচপুর এলাকা পার হওয়ার পর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তীব্র যানজটে পড়েন তিনি। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, পথের এই যানজটের কারণে আমি গত দেড় বছর ধরে কেবল ট্রেনে যাতায়াত করি। কিন্তু আজকে শিডিউলে রেল এত গড়বড় করেছে যে, উপায় না দেখে বাসে উঠেছি। কাঁচপুর থেকে ভুলতা এলাকা পার হতে আড়াই ঘণ্টা লেগেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন
একই দিনে দুটি ট্রেনের লাইনচ্যুতির ঘটনা তদন্তে বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (রেল) মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেল দুর্ঘটনা নিয়ে তার মন্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি লাইন কেটে দেন। তাকে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি জবাব দেননি। বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) জহিরুল ইসলাম ও বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ ও ওয়াগন) রাসেল আলমকে ফোন করা হলে তারাও সাড়া দেননি। বার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) এ এম সালাহ উদ্দিন।
রেলওয়ে কমান্ড্যান্ট মো. তারিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি শুধু জানি ডিআরএম আরিফ স্যারকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন ডিজি স্যার (রেলওয়ের মহাপরিচালক)। তাদের দ্রুততম সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা-খুলনা রুটে নতুন রেলপথে গতিসীমার তারতম্য করে ট্রেন চালাতে হয়। অতিরিক্ত গতি নিয়ে চলাচল করতে গেলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা রয়েছে। আর নারায়ণগঞ্জ কমিউটার ট্রেনটি বহু পুরোনো ক্যারেজ ও র্যাক নিয়ে চলাচল করছে। পঞ্চগড় এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হচ্ছে, রেললাইন ভাঙা ছিল। তবে রেলওয়ে কর্মকর্তারা সেটি নাকচ করে দিয়েছেন।




