দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ২০০৯ সালের পর থেকে এই পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বছরে কমপক্ষে ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, তা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার সপরিমাণ। এই টাকা দিয়ে পাঁচ থেকে ছয়টি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। পাচার হওয়া অর্থের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে ৯ বিলিয়ন ডলার এবং বাকি টাকা পাচার হয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে। তিনি বলেন, পাচার করা এই টাকা দেশে ফেরত আনা সম্ভব। যদি ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও আমলারা একসঙ্গে কাজ করেন।
শনিবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইআরএফ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ (এসবি) ‘অডিয়াস ডেট অ্যান্ড রিকভারি অব বাংলাদেশ’স লন্ডারড ওয়েলথ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য হিসাব করা কঠিন। সেটি কোনো দিনই হিসাব করা সম্ভব হবে না বলেই আমি মনে করি। ব্যাংক থেকে পাচার করা, ব্যাংক লুণ্ঠনের মাধ্যমে পাচার করা অর্থ এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে কুক্ষিগত করে ১৭ বিলিয়ন ডলার পাচার করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আরও অনেক বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই টাকা পাচারের সিংহভাগ আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে লুটপাট ও মিস ইনভয়েসিংয়ের (চালান জালিয়াতি) মাধ্যমে। এই দুটি ক্ষেত্রে যারা ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যারা রাষ্ট্রকাঠামোকে দখল করে ফেলেছিলেন, কর্তৃত্ববাদের বিকাশ যাদের মাধ্যমে হয়েছে- তারাই যুক্ত ছিলেন। তাদের কর্তৃত্ববাদের বিকাশের মূল উপাদান ছিল- তাদের ক্ষমতায় থাকতেই হবে, অবৈধ সম্পদ অর্জন করতেই হবে। সেটা করতে গিয়ে সবাইকে দলীয়করণের মাধ্যমে, পেশাগত দেউলিয়াপনার মধ্যে ফেলে দিয়ে- এটা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে করে এই ‘সিস্টেমটা’ এবং পাচারের সুযোগ নিশ্চিত করা যায়।’
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিটির প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের ঋণখেলাপির সংস্কৃতির পাইওনিয়ার যারা, তারাই কিন্তু ব্যাংকিং খাতে কী নিয়ম হবে, কী প্রক্রিয়া ও সংস্কারের মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে- সেই সংজ্ঞাটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সে কারণে এটা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো সুযোগ ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়, সেখানে আইন প্রতিষ্ঠান সবই আছে। অনেক ক্ষেত্রে কঠোর আইন আছে, ধরা পড়লে কঠোর শাস্তিও আছে। কিন্তু একইভাবে সেসব দেশে যারা অর্থ পাচারের সুযোগ করে দেওয়ার মতো একটি সুগঠিত পেশাজীবীদের সিন্ডিকেট আছে তারা সেই সুযোগগুলো করে দেন।’ ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পাচার হওয়া টাকা তাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে। এটার মাধ্যমে তারা লাভবান হন। এ কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। তবে এখন আমাদের সামনে তাকাতে হবে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না-এ ব্যাপারে প্রথম উত্তর হলো, অবশ্যই সম্ভব। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হবে- এটা খুবই কঠিন। এটা সম্ভব হবে, যদি যেসব দেশে পাচার হয়েছে এবং যেসব দেশ থেকে পাচার হয়েছে (যেমন বাংলাদেশ) সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট-কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে একটা প্রক্রিয়া শুরু করার মতো জায়গায় যেতে পারে। সেটাও অনেক দীর্ঘসূত্রতার ব্যাপার। এ কারণে আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে, আস্থা রাখতে হবে।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরুর পাশাপাশি পাচার হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। এ কারণে, শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যক্তির পরিবর্তন করলে হবে না, বরং সেগুলোর সংস্কারের পরিবর্তন করতে হবে।’
সেমিনারে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মীরধা। মডারেটর ছিলেন গ্রিনওয়াচ ঢাকার সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার। মূল বক্তা ছিলেন ওয়েস্ট সিডনি ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া এবং আর্থিক অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করায় এখন গুরুত্ব দিতে হবে। এসব উদ্যোগ নিলে পাচার হওয়া টাকার পুরোটা না হলেও কিছু অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হবে। এতে ভবিষ্যতে অর্থ পাচারের বেলায় সবাই সাবধান হয়ে যাবেন।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রভাবশালীরা পাচার করা অর্থ হজম করে ফেললে তা ভবিষ্যতের জন্য ভালো উদাহরণ হবে না। সে জন্য পাচারকারীদের স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে, যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাচারের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।’
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইআরএফের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম ও সম্ভাবনার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব মাশরেকী এবং অর্থনীতিবিদ নাঈম চৌধুরী প্রমুখ।