ঢাকা ৮ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
দুপুরের মধ্যে ঝড়ের শঙ্কা, নদীবন্দরে সতর্কতা মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও নায়ক হতে প্রস্তুত এমবাপ্পে সাতসকালে ঢাকার বায়ুমান নিয়ে দুঃসংবাদ আজও মেসি জাদুর অপেক্ষায় বিশ্বকাপের মঞ্চে এমবাপ্পের ‘সেঞ্চুরি’, অনন্য এক ইতিহাসের সামনে ফরাসি তারকা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালান জিয়াউল পালানোর সময় ছাদ থেকে পড়ে আ. লীগ নেতা নিহত ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করে ইরানই বিজয়ী ঐতিহ্যের স্থাপনা ‘গৌরীপুর লজ’ এখন ব্যাংকারদের গেস্ট হাউস নিউজিল্যান্ডের হয়ে প্রথম গোল করা কে এই ফিন সারম্যান? ২২ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ২২ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুতদের নতুন চাকরি মিলছে না আর্জেন্টিনার সামনে এবার ইউরোপীয় পরীক্ষা, অঘটনের স্বপ্ন অস্ট্রিয়ার জয়ের খোঁজে জর্ডান-আলজেরিয়া ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্স ও ইরাকের অসম লড়াই ২২ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি আরেকটি ঐতিহাসিক রাতের অপেক্ষায় কুরাসাও আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচে কার জয়ের সম্ভাবনা কত, জানাল সুপারকম্পিউটার ৩৩ ম্যাচেই ১০০ গোল! হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে বিয়েলসার ক্ষোভ ইরানের রক্ষণদুর্গে আটকে গেল বেলজিয়াম গোল বাতিল ইরানের, গোলশূন্য প্রথমার্ধ বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের রেকর্ড পেলের কীর্তিতে ভাগ বসালেন ইয়ামাল জন্মবার্ষিকীতে স্মরণানুষ্ঠান: সুফিয়া কামালের ব্যক্তিত্ব সবাইকে আলোকিত করে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা সৌদিকে উড়িয়ে দিল স্পেন

লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব এস আলম গ্রুপের বিনিয়োগ সুরক্ষা করবে

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৪, ১২:১১ এএম
আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২৪, ১২:৪০ পিএম
সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব এস আলম গ্রুপের বিনিয়োগ সুরক্ষা করবে
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম দাবি করেছেন, সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব ও একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তি তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা চাপ ও ভীতি প্রদর্শনের হাত থেকে রক্ষা করবে। সাইফুল আলম ও তার পরিবারের পক্ষে তাদের আইনজীবীরা এক চিঠিতে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সতর্ক করেছেন। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, যদি তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, তবে তারা আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা করবেন। 

মঙ্গলবার (১৯ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অভিযোগ করেছেন, সাইফুল আলম ও তার সহযোগীরা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অন্তত ১.২ ট্রিলিয়ন তথা ১০ বিলিয়ন টাকা ‘লুট’ করেছেন। এমন অভিযোগের পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইন সংস্থা কুইন ইমানুয়েল উরকুহার্ট অ্যান্ড সালিভান তাকে ওই চিঠিতে এস আলমের পক্ষে সতর্কবার্তা দিয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, গভর্নর ‘উসকানিমূলক ও ভিত্তিহীন মন্তব্য’ করেছেন, যা একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের খ্যাতি নষ্ট করতে পারে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এই ব্যবসায়িক গ্রুপ বাংলাদেশে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ২ লাখ লোককে কর্মসংস্থান দিয়েছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইফুল আলমের চিঠি এবং আন্তর্জাতিক সালিশি প্রক্রিয়া শুরু করার হুমকি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এই সরকার ক্ষমতায় আসে।

এরপর গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত হন আহসান এইচ মনসুর। তিনি আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা। গত মাসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সাইফুল আলম ও তার সহযোগীরা প্রভাবশালী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সহায়তায় দেশের ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অর্থ পাচার করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তারা ব্যাংক লুট করতে নতুন শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ঋণ এবং অতিরিক্ত মূল্যযুক্ত আমদানি চালানের মতো কৌশল ব্যবহার করেছেন।

খাদ্য, নির্মাণ, পোশাক কারখানা ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে এস আলম গ্রুপ। এই গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম, তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং তাদের ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহির গ্রুপটির মালিকানা ও বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন। ল ফার্ম কুইন ইম্যানুয়েলের মাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে গত মাসে গভর্নরের অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে শিল্প গ্রুপটি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই অভিযোগগুলোর ‘কোনো সত্যতা নেই’।

সর্বশেষ চিঠিতে গভর্নরের উদ্দেশে বলা হয়েছে, আপনার বক্তব্যগুলো এস আলম গ্রুপকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে একটি পরিকল্পিত প্রচার। এর ফলে এস আলমে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আপনি এই প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বা এটি পরিচালনা করছেন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, ওই চারজন বিনিয়োগকারীই সিঙ্গাপুরের নাগরিক। তবে সাইফুল আলমের পরিবার কখন সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব পেয়েছে এবং তারা এখনো বাংলাদেশের নাগরিক কি না, এই বিষয়ে কোনো তথ্য নেই চিঠিতে। সিঙ্গাপুর সরকারও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে ২০০৪ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি রয়েছে।

আহসান মনসুরের বক্তব্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। এতে বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে বিনিয়োগকারীরা ১৯৮০ সালের বাংলাদেশি বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আইন অনুযায়ী ‘অধিকার এবং সুরক্ষা’ উপভোগ করেন। তারা তাদের অধিকার রক্ষার জন্য অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। কিন্তু সীমাবদ্ধ নয়, এমন সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে একটি বিকল্প হলো আন্তর্জাতিক সালিশি কেন্দ্রের মাধ্যমে বিরোধের সমাধান চাওয়া। 

চিঠির প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি যে দাবিগুলো করেছিলেন সেগুলো ‘সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত’। তিনি বলেন, এই অভিযোগের পেছনে অনেক ব্যাংক এবং বছরের পর বছর বিস্তৃত দুর্নীতি জড়িত রয়েছে। এসবের নথিভুক্তকরণ এখনো চলছে। পূর্ণ নথি প্রক্রিয়া করতে কিছু সময় লাগবে।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, পোশাকশিল্পে অর্ডার বাতিল এবং ভারতের পক্ষ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক অবস্থান। যেখানে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার হুমকি নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, সাইফুল আলম এবং তার পরিবার আইনি লড়াইয়ের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণভাবে এবং আইন অনুসারে সমস্যা সমাধান করতে চান। তাদের উদ্দেশ্য দীর্ঘ এবং খরচসাপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া এড়ানো। তবে চিঠিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যদি তিনি তাদের অধিকার লঙ্ঘন করতে থাকেন এবং মিথ্যা বক্তব্য দেন, তাহলে এস আলম আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবেন। সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ০৯:১৩ এএম
মালেশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার আশা আছে জটিলতাও
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দিনের সফরে গতকাল রবিবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছেছেন। সেখানে আজ তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত এবং পরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার কথা থাকলেও মূল টার্গেট থাকবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার ঘোষণা। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তার সম্ভাবনা কম। 

এই সফরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ফের মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু এ রকম ঘোষণা আসার ক্ষেত্রে দুই দেশেই রয়েছে অনেক জটিল ও গভীর সমস্যা। কাজেই এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানও করতে হবে যৌথভাবে। কারণ মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশের সরকারের ভেতরে ও বাইরের সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি মালয়েশিয়ার সরকারের ভেতরের ও বাইরের সিন্ডিকেটও সমানভাবে দায়ী।

এ ক্ষেত্রে একটি মজার বিষয় হচ্ছে, এই সিন্ডিকেট নির্মূলে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে জোরালো কোনো উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি। সিন্ডিকেট নির্মূল ও দুর্নীতি রোধে দুই দেশের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, কিন্তু সে উদ্যোগটি অনুপস্থিত। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা বাংলাদেশে মামলা খেয়ে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে অবস্থান করলেও যৌথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে মালয়েশিয়ার নাগরিক যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে এই শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ কতটা স্থায়ী হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তবুও আশা, এই সফরে ইতিবাচক কিছু একটা হবে। 

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে জানান, মালয়েশিয়ার এই শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট প্রথা উভয় দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বহুরূপী প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়। এর বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। না দেশে, না মালয়েশিয়ায়। সিন্ডিকেটের দুর্নীতিবাজরা নানা ভিসায় গিয়ে সে দেশে অবস্থান করলেও উভয় সরকার যৌথ পদক্ষেপ নেয়নি।

দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংয়ে সংকট নিয়ে ভাসা ভাসা আলোচনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ আজও দেখা যায়নি। কাজেই দুর্নীতিবাজদের নির্মূল না করতে পারলে যেনতেনভাবে এই শ্রমবাজারটি খুললেও ফের বন্ধ হয়ে যাবে। এই শ্রমবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শক্ত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট ফের তৈরি হবে এবং বাজারটি বন্ধ হয়ে যাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নানা কারণে এই শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে। শ্রমিক নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ব্যয়, ভিসা জটিলতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়ম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে মামলা আছে, সেগুলো প্রত্যাহারসহ বহু বিতর্ক রয়েছে এখানে। এই শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতারণার হাজারও ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রম সংস্থাগুলোর চাপে আছে মালয়েশিয়া সরকার।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব চাপ উত্তরণে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে শ্রমবাজারটি খোলার ক্ষেত্রে আরও দেরি হতে পারে। তবে আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক থেকে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, শ্রমিক নিয়োগে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তাই নতুন করে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু সফরে শ্রমবাজার পুনরায় পুরোপুরি সচল করা, নতুন কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধতা দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় আট লাখ কর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে তিন লাখ রয়েছেন অনিয়মিত। এদের বৈধকরণের বিষয়টিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তোলা হবে। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় বিদেশি কর্মীদের বৈধকরণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হচ্ছে দেশটি বিদেশি কর্মীদের যতবারই বৈধকরণ করেছে, ততবারই নতুন করে ট্যুরিস্ট ভিসায় বা নদীপথে অবৈধ উপায়ে বিদেশি কর্মীরা ঢুকে পড়ে অধিক সংখ্যায় অবৈধ হয়েছেন। এ কারণে ফের আনুষ্ঠানিক বৈধকরণের ঘোষণা দেবে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।

এদিকে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার নেতারা মালয়েশিয়া সফরের আগে সিন্ডিকেট বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। সংগঠনের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফকরুল ইসলাম জানান, অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে মালয়েশিয়ায় কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

শত শত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার সংকট ও বন্ধের মুখে পড়েছে। তিনি শ্রমবাজারটি সিন্ডিকেটমুক্ত করতে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, নেপালসহ ১৪টি দেশ সিন্ডিকেটমুক্ত উপায়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠায়। নেপালেও সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু সে দেশের সরকার সেটি হতে দেয়নি। তাই শুধু বাংলাদেশি কর্মী পাঠাতেই কেন সিন্ডিকেট থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সফর-পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সফরে অনেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হলেও তার বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল না। তাই এবার শুধু চুক্তি নয়, বরং এফটিএ চূড়ান্তকরণ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিনিয়োগ সহজীকরণ, ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি বাজার, নতুন বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার এই সময়ে এই সফরকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। 

বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশ। দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন, লজিস্টিকস এবং শিল্প খাতে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমি-কন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল শিল্পে নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আসতে পারে। বাংলাদেশের ২০ কোটির বিশাল বাজার, তরুণ কর্মশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া এই সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ এনে দিতে পারে। কারণ মালয়েশিয়া আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের অন্যতম সদস্যরাষ্ট্র। বাংলাদেশও আসিয়ানের সদস্য হতে চায়, এ জন্য দেশটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়াতেও রয়েছে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আছে ১৩ লাখ। এসব রোহিঙ্গা মায়ানমারে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার মাধ্যমে আসিয়ানকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ আছে। এ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনাও হবে বলে কূটনীতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

সাতসকালে ঢাকার বায়ুমান নিয়ে দুঃসংবাদ

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম
সাতসকালে ঢাকার বায়ুমান নিয়ে দুঃসংবাদ
ছবি: সংগৃহীত

মেগাসিটি ঢাকার বাতাসে দিন দিন বাড়ছে দূষণ। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হলে শহরটির বায়ুমানে কিছুটা উন্নতি হয়। তবে বৃষ্টিপাত হওয়ার পরেও ঢাকার বাতাসে দেখা দিয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

সোমবার (২২ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্যানুযায়ী, ২৫৩ স্কোর নিয়ে প্রথম অবস্থানে উঠে এসেছে ভারতের রাজধানী দিল্লি, যা সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত।

একই সময়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ১৬৭ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। এ ছাড়া ১৬৭ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইন্দেনেশিয়ার জার্কাতা, ১২৭ স্কোর নিয়ে চর্তুথ অবস্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহর এবং এবং পঞ্চম অবস্থানে থাকা ইসরাইলের তেল আবিবের স্কোর ১০৯।

বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচক ৫০-এর নিচে থাকলে বিশুদ্ধ বাতাস ধরা হয়। ৫১ থেকে ১০০ হলে তা সহনীয়। ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে হলে সতর্কতামূলক বা সংবেদনশীল মানুষের (শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি) জন্য অস্বাস্থ্যকর। ১৫১ থেকে ২০০ হলে সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর এবং সূচক ২০১ থেকে ৩০০ হলে বাতাসকে খুব অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। আর সূচক ৩০০ ছাড়ালে সেই বাতাস দুর্যোগপূর্ণ।

বায়ুদূষণ সব বয়সের মানুষের জন্য ক্ষতিকর। তবে শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি, প্রবীণ ও অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য এটি বেশি বিপজ্জনক।

অন্তরা/

নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালান জিয়াউল

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালান জিয়াউল
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এক সেনাসদস্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ ১৫০-২০০ মানুষকে গুম ও হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস এক মামলায় দেওয়া জবানবন্দিতে গতকাল রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এসব বর্ণনা দেন।

ট্রাইব্যুনাল থেকে বের হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আদালতে এই জবানবন্দি দিয়েছেন ইমরুল কায়েস।

এই মামলার একমাত্র আসামি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের উপস্থিতিতে জবানবন্দি দেন সেনাসদস্য। চিফ প্রসিকিউটর জবানবন্দির বরাতে বলেন, বিডিআরের বিভিন্ন সদস্যকে ধরে এনে দুটি পদ্ধতিতে হত্যা করেছেন জিয়াউল আহসান। এর মধ্যে কাউকে ইনজেকশন পুশ করে, আবার কাউকে মাথায় গুলি ঠেকিয়ে হত্যার পর নদীতে ফেলে দিতেন। এই দুই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ থেকে ১২ জন বিডিআর সদস্যকে তিনি হত্যা করেছেন।

রাজধানীর বনানী থেকে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম হন ইলিয়াস আলী। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে সেনা পোশাক পরা ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে তিনি প্রেষণে কর্মরত ছিলেন। র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের পরিচালকের ‘রানার’ হিসেবে তিনি নিয়োগ পান। রানার হিসেবে তিনি জিয়াউল আহসানের সঙ্গে থাকতেন।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘২০১২ সালের সম্ভবত ১৩ এপ্রিল হেডকোয়ার্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যারসহ আমরা মহাখালী ফ্লাইওভারের নিকট যাই। কাকে গাড়িতে পিক করবে, তা আমি জানতাম না। জিয়া স্যার গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন। টার্গেট কখন আসবে, তা জানার জন্য ফোন করছিলেন। একটা পর্যায়ে জানা যায় যে টার্গেট আসবে না। পরে সেখান থেকে জিয়া স্যারকে বাসায় নামিয়ে দিই এবং স্যারকে বলে পরের দিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে যাই।’

তিনি জবানবন্দিতে বলেন, ‘ছুটিতে থাকা অবস্থায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমি জানতে পারি যে ইলিয়াস আলী নামের একজন বিএনপি নেতাকে মহাখালী ওভারব্রিজের ওখান থেকে অপহরণ করা হয়েছে। ৯ দিন ছুটি শেষে এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখে আমি কর্মস্থলে যোগদান করি। যোগদানের পর আমি র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে থমথমে পরিবেশ লক্ষ করি। অন্য সদস্যদের মাধ্যমে জানতে পারি, কোতের (অস্ত্রাগার) অস্ত্রের ইন-আউট রেজিস্টার এবং সিসিটিভি ফুটেজ জিয়া স্যার নষ্ট করে ফেলেন।’

সেনাসদস্য জবানবন্দিতে বলেন, “ওই সময় স্যারের ফোনে অন্য একটি কল এলে স্যার বলেন, ‘তুই রাখ, তারেক স্যার {সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক} ফোন দিয়েছেন।” জিয়া স্যার তারেক স্যারের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। অপর প্রান্তে কী বলেছে, আমি জানি না। তবে জিয়া স্যার অভিযোগের সুরে বলছিলেন, ‘স্যার, আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে! এর চেয়ে আমি কমান্ডো মানুষ, আমাকে জঙ্গলে পোস্টিং দিয়ে পাঠায়ে দেন, এটাই আমার ভালো।’

চিফ প্রসিকিউটর বাংলাদেশ-ভারতজুড়ে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের কিলিং নেটওয়ার্ক ছিল বলেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগে হওয়া মামলায় জিয়াউলের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছেন এই সেনাসদস্য।

সাক্ষ্যে তিনি বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর চিত্র তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে একটি ছিল জিয়াউলের জাফলং অপারেশন। অর্থাৎ র‌্যাবের টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামিকে নিয়ে জিয়াউলের নেতৃত্বে জাফলংয়ে গিয়েছিলেন সাক্ষীসহ আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। জাফলংয়ে যাওয়ার পর আরও দুজন আসামিকে নিয়ে আসেন ভারত থেকে আসা সাদাপোশাকের কিছু লোকজন। এরপর এসব আসামিকে বিনিময়ের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়। 

জবানবন্দির বরাতে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জিয়াউল আহসান ভারত থেকে আনা দুজনকে রাস্তায় মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করেন। এভাবেই তিনি হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন। ভারতের লোকজনকে জিয়াউল আহসানের অনুসারীরাই হয়তো নিয়ে আসতেন। তারা কোনো দলের বা কোনো বাহিনীর হতে পারে। অর্থাৎ জিয়াউলের এই কিলিং নেটওয়ার্ক ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে ছিল। তবে ভারত থেকে সাদাপোশাকে আসা লোকজন যে দুজন ব্যক্তিকে হস্তান্তর করেছিলেন, তারা ভারতের নাকি বাংলাদেশের নাগরিক তা যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান বর্তমান সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। জবানবন্দিতে তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমসহ ১৫০ থেকে ২০০ মানুষ হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন।

বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

জবানবন্দিতে ৪৩ বছর বয়সী সাক্ষী ইমরুল কায়েস বলেন, “আমি ২০০১ সালের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করি। আমার চাকরির একটি পর্যায়ে ২০১০-১২ সাল পর্যন্ত র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে প্রেষণে কর্মরত ছিলাম। কর্মরত থাকা অবস্থায় র‌্যাব হেডকোয়ার্টার ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে চাকরি করি। আমি ২০১০ সালের ১০ আগস্ট র‌্যাবে পোস্টিং হয়ে আসি। আমরা যারা পোস্টিং হয়ে আসি প্রথমে আমাদের অ্যাডমিন উইংয়ে রাখা হয়।

পরবর্তীকালে র‌্যাবের বিভিন্ন ইউনিট বা সংস্থায় বদলি করা হয়। আমি বদলির অপেক্ষায় ছিলাম। এ অবস্থায় সিভিল পোশাকে তৎকালীন লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার (বর্তমানে অব. মেজর জেনারেল) র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে আসেন। তিনি আমার পূর্বপরিচিত ছিলেন। ২০০৪ সালে আমি তার অধীনে আর্মি কমান্ডো কোর্স করি। তখন উনি কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নে আমি তার অধীনে কর্মরত ছিলাম। তা ছাড়া তখন তিনি আমাদের ব্যাটালিয়নে ক্যানটিন অফিসার ছিলেন। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল। দেখা হওয়ার পর স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কিরে ইমরুল তুই এখানে?’ আমি স্যারকে তখন বলি, ‘স্যার আমার র‌্যাবে পোস্টিং হয়েছে।’ স্যার জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে আমার পোস্টিং হয়েছে? আমি বললাম, স্যার আমার ১২ ল্যান্সার থেকে পোস্টিং হয়েছে। তখন স্যার আমার নাম ও নম্বর দিতে বলেন। আমি আমার নাম ও নম্বর স্যারকে দিই। তার দুই-তিন দিন পরেই র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে পোস্টিং হয়।”

“এরপর আমি ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের স্বাভাবিক ডিউটি যেমন–স্ট্যান্ডবাই প্যাট্রল, এয়ারপোর্ট ডিউটি, র‌্যাবের বিভিন্ন ইউনিটে যেখানে আমরা সংযুক্ত থাকি সেখানে ডিউটি করতে থাকি। আমি মোহাম্মদপুর ক্যাম্পে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় সিনিয়র ডিএডি (নাম মনে নেই) আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘ইমরুল তোমাকে ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্সের রানার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’ যা র‌্যাবে বডিগার্ড হিসেবে বলা হয়। জিয়াউল স্যারের রানার থাকা অবস্থায় আমার কাজ ছিল–সব সময় স্যারের সঙ্গে থাকা এবং স্যার যেখানে প্রয়োজন মনে করতেন, সেখানে আমাকে নিয়ে যেতেন। স্যারের সঙ্গে আমি বিভিন্ন জায়গায় যেমন জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি হেডকোয়ার্টার, ডিবির প্রধান কার্যালয় (তখন ডিবির প্রধান ছিলেন মনির স্যার) ইত্যাদিতে যেতাম। মাঝে মাঝে সচিবালয়ে যেতাম।

এ ছাড়া স্যার বিভিন্ন ব্যক্তির বাসায় যেতেন। তার মধ্যে মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকীর (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিকিউরিটি চিফ অ্যাডভাইজার) বাসায় যেতেন। আমিও স্যারের সঙ্গে যেতাম। তারেক সিদ্দিকী স্যারের সঙ্গে জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। তারেক সিদ্দিকী স্যারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আমার স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। জিয়া স্যার যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতেন, তখন তার গাড়িতে অস্ত্র-অ্যামুনিশন থাকত, কিন্তু জিয়া স্যারের গাড়ি বিধায় তা তল্লাশি করা হতো না। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি যেমন–মাহবুবুল হক হানিফ, আমির হোসেন আমু এবং জাহাঙ্গীর কবীর নানকের সঙ্গেও জিয়া স্যারের ভালো সম্পর্ক ছিল। স্যার তাদের বাসায় যেতেন।”

সাক্ষী আরও বলেন, “রানার হিসেবে যোগদান করার ২০-২৫ দিন পর রাত আনুমানিক ১২টা, সাড়ে ১২টার দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘কই তুই?’ আমি বলি, আমি লাইনে আছি। স্যার তখন আমাকে র‌্যাব-১-এর সামনে যেতে বলেন। ওখানে যাওয়ার পর দেখি দুটি কালো রঙের হাইএইস মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে। স্যার আমাকে একটি মাইক্রোবাসে উঠতে বলেন। আমি সেই গাড়িটিতে উঠি। ওই গাড়িতে জিয়া স্যার বসে ছিলেন।

গাড়িতে ওঠার পর স্যার আমাকে বলেন, পেছনে একটি বস্তা আছে, বস্তাটি ফেলে দিতে হবে। ওই গাড়িতে র‌্যাব-১-এর সিও রাশেদ স্যার এবং ক্যাপ্টেন কাউসার স্যার ছিলেন। আরও দুজন ছিলেন আমি তাদের চিনি না। রাত আনুমানিক পৌনে ১টার দিকে র‌্যাব-১ থেকে বের হয়ে জসীম উদ্দিন (উত্তরার) হয়ে টঙ্গীর দিকে আহসান উল্লাহ ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে বেশ কিছু দূর যাই। যাওয়ার পর সেখানে একটি রেলক্রসিং পড়ে, রাস্তার দুই পাশে গাছগাছালি ছিল, সেখানে আমাদের গাড়িগুলো থামে। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন যে ‘ইমরুল ডিক্কিটা খোল, বস্তাটা বের কর।’ আমি ডিক্কি খুলে বস্তা নামানোর উদ্দেশ্যে হাত দিলে দেখি সেটি বস্তা না, বরং একটা ডেড বডি ছিল এবং ঠাণ্ডা ছিল। প্রথম অবস্থায় আমি ভয় পেয়ে যাই। আমার সঙ্গে যারা ছিল, তাদের সহায়তায় বডিটা রেললাইনের পাশে নিয়ে রাখি। স্যার সেখানে দাঁড়ানো ছিল। বডিটা সেখানে রেখে আমি মাইক্রোতে চলে আসি। তখন দেখি যে জিয়া স্যারসহ সেখানে থাকা অন্যরা বডিটা রেললাইনের ওপরে রাখেন এবং তারা গাড়িতে ফিরে আসেন। তার কিছুক্ষণ পর একটি ট্রেন এসে চলে যায়। তারপর আমরা ওখান থেকে চলে আসি।”

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘লাইনে ফিরে আসার পর পাঁচ-সাত দিন আমি অস্বাভাবিক ছিলাম। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিল যে আমি কোথায় এলাম, কীভাবে চাকরি করব। আমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারছিলাম না। এই ঘটনার কিছুদিন পর আমি জিয়াউল আহসান স্যারের সঙ্গে কয়েকবার সুন্দরবন অপারেশনে যাই। তার মধ্যে একটি অপারেশনের কথা আমার মনে আছে। আমরা বোটে করে সুন্দরবন অপারেশনস্থলে যাই। ওই সময় সেখানে নদীর ভাটা ছিল। আমাদের সঙ্গে র‌্যাব-৮-এর সদস্যরাও ছিলেন। আমাদের বোট থামার পর জঙ্গলের ভেতর থেকে দু-তিন রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমাদের ফায়ার করার নির্দেশ দেওয়া হলে আমরা র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের সদস্যরা এবং র‌্যাব-৮-এর সদস্যরা ফায়ার করি। ভাটা থাকার কারণে কাদায় আমাদের হাঁটু পর্যন্ত দেবে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে আমাদের ফায়ার বন্ধ করার নির্দেশ দেন।

সেখানে জিয়াউল আহসান স্যার, র‌্যাবের এডিজি (অপস) মুজিব স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার এবং মিডিয়ার সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। আমরা জঙ্গলের ভেতরের দিকে যাই এবং দেখি সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দু-তিনটি লাশ পড়ে আছে। গাছের ডালপালা দিয়ে সেখানে একটি হাঁটার রাস্তা দেখতে পাই। রাস্তার দুই পাশ দিয়ে ছোট ছোট ঘর ছিল। সেখানে জলদস্যুরা বসতে পারত। সবগুলো ঘরই গাছের ডাল দিয়ে তৈরি ছিল। একটি গাছের ওপর একটি ওপি (অবজারভেশন পোস্ট), যার চারপাশে বুলেটপ্রুফ পাত লাগানো ছিল দেখতে পাই। এ ছাড়া আমরা দুটি বোট দেখতে পাই। বোটগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যাদি ছিল যেমন–সিগারেট, মদের বোতল, বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী ও একটি ছাগলও ছিল। ছাগলটি আমরা দুপুরের খাবারের সময় জবাই করে খেয়েছিলাম। এই অপারেশনটি আমার কাছে একটি সাজানো অপারেশন মনে হয়েছিল।’

সাক্ষ্যে তিনি বলেন, “বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’ নামে একটি অপারেশন পরিচালনা করা হয় পলাতক বিডিআর সদস্যদের ধরার জন্য। ওই সময় জিয়াউল আহসান স্যার ৮-১০ জন লোককে হত্যা করেন। যাদের হত্যা করেছেন তারা বিডিআর সদস্য ছিল এবং আমাদের অফিসারদের এরা হত্যা করেছে বলে জিয়া স্যার বলেছেন। এই লোকগুলোকে দুভাবে হত্যা করা হয়েছে। একটি ছিল ইনজেকশন পুশ করে এবং আরেকটি ছিল পোস্তগোলা ব্রিজের কাছে আর্মি ক্যাম্প আছে, তার ভেতর দিয়ে বোটে করে নদীতে নিয়ে সিমেন্ট ভরা একটি বস্তা নিচে রাখা হতো, তার ওপর যে ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে, তাকে রাখা হতো, তার ওপর আরেকটি সিমেন্ট ভরা বস্তা রেখে রশি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ফেলা হতো। পরে মাথায় গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।”

সেনাসদস্য বলেন, “২০১১ সালের রমজান মাসের শেষের দিকে আমি লাইনে ছিলাম। একদিন ইফতারের পূর্বমুহূর্তে জিয়াউল আহসান স্যার ফোন দিয়ে আমাকে ক্যামেরা নিয়ে উত্তরা নর্থ টাওয়ারের ওখানে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে আমি স্যারকে পাইনি। একটু পরে জিয়া স্যার ফোন দিয়ে আমাকে আরেকটু সামনে যেতে বলেন। ওই দিন আমি ইফতার করতে পারিনি। নর্থ টাওয়ার থেকে সামনে গিয়ে দেখি চারজন লোককে ক্রসফায়ার দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তারা নাকি ডাকাতি করার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই অপারেশনটা সাজানো ছিল।

২০১২ সালের প্রথমদিকে তিনটি মাইক্রোতে করে আমরা ১১ জন আসামি নিয়ে জিয়াউল স্যারের নেতৃত্বে পোস্তগোলা আর্মি ক্যাম্পের ওখানে যাই। সেখানে ওই ১১ জন আসামিকে বোটে ওঠানো হয়। জিয়া স্যার কাছে ডাকলে গিয়ে দেখি–এই বোটটি সেই বোট, যেটি সুন্দরবন অপারেশনে জলদস্যুরা ব্যবহার করেছিল। তখন হঠাৎ করে একজন আসামি পানিতে ঝাঁপ দেয়। জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ‘ইমরুল ধর ধর।’ স্যারের আদেশে আমি পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ওই আসামিকে ধরি। রশির সাহায্যে আমাকে এবং ওই আসামিকে বোটে ওঠানো হয়। ওই সময় অন্ধকার ছিল। আমি আসামিকে চিনতে পারিনি। তবে তার বয়স আনুমানিক ২৫-২৬ বছর হবে। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আমি অনেক ময়লা পানি খেয়েছি। পরে আমি বমি করি এবং দুর্বল হয়ে যাই। বোটটি নদীর মাঝখানে নিয়ে পূর্বের ন্যায় এই ১১ জনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। ওই অপারেশনে জিয়া স্যার, মেজর নওশাদ স্যার, স্কোয়াড্রন লিডার সাইফ স্যার, কমান্ডার সোহায়েল স্যার, এডিজি (অপস) মুজিব স্যার ছিলেন। অপারেশন শেষে আমরা লাইনে চলে আসি।”

তিনি বলেন, ‘২০১২ সালের মাঝামাঝি র‌্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে দুজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে জাফলং বর্ডারে যাই। দুজন আসামিরই হাত বাঁধা এবং মাথায় জমটুপি পরানো ছিল। আনুমানিক রাত ২টা বা আড়াইটার দিকে আমরা সেখানে পৌঁছাই। সেখানে ভারত থেকে দুজন আসামি নিয়ে সিভিল পোশাকে চার-পাঁচজন লোক এসে তাদের আমাদের কাছে হস্তান্তর করে। আমাদের কাছে থাকা দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করি। ভারত থেকে প্রাপ্ত দুজন আসামি নিয়ে আমরা জিয়া স্যারের নেতৃত্বে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করি। জাফলং বর্ডার থেকে আনুমানিক ২৫-৩০ কিলোমিটার আসার পর গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয় এবং জিয়াউল আহসান স্যার তাকে গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেন। ওই সময় স্যারের নির্দেশে আমি এবং অন্য একজন গাড়ির সামনে এবং পেছনে সিকিউরিটি হিসেবে দাঁড়াই। অন্য আসামিকে নিয়ে রওনা করে ১০-১৫ কিলোমিটার যাওয়ার পর একইভাবে তাকে জিয়াউল আহসান স্যার গুলি করে হত্যা করেন।’

‘তার বেশ কিছুদিন পর র‌্যাব-৪-এর সেইফ হাউস থেকে দুজন আসামিকে দুইটা মাইক্রোতে নেওয়া হয়। আনুমানিক আধা ঘণ্টা চলার পর গাড়িটি তিন মাথার মোড়ে এক জায়গায় থামানো হয়।’

সাক্ষী পরে ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘গাড়ি দুটি থামানো হয়। আমি যে গাড়িতে ছিলাম সে গাড়ি থেকে একজন আসামিকে নামানো হয়। আমি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। জিয়াউল আহসান স্যার ওই আসামিকে নিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেন। ওই আসামির মাথায় অনেক চুল থাকার কারণে মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। তা দেখে উপস্থিত সবাই হাসাহাসি করছিল। ওই আসামির হাত এবং চোখ গামছা দিয়ে বাঁধা ছিল। আসামিকে হত্যা করার পর আমরা গিয়ে স্যারের নির্দেশে গামছাগুলো খুলে নিয়ে এসে গাড়িতে বসি। আমাদের গাড়ি নিয়ে র‌্যাব-৪-এ চলে যেতে বলেন। জিয়া স্যার অপর আসামিকে নিয়ে চলে যান। জিয়া স্যার যখন র‌্যাব-৪-এ ফেরত আসেন, তখন ওই আসামি তার সঙ্গে ছিল না। কিছু কিছু অপারেশন স্যার আমার অগোচরে করতেন। যেটাতে তিনি প্রয়োজন মনে করতেন, সেটাতে আমাকে নিয়ে যেতেন।’

“এই ঘটনার এক-দুই সপ্তাহ পর আমি লাইনে ক্যারম খেলছিলাম, তখন জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘র‌্যাব-১-এর সামনে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়ানো আছে, সেখানে গিয়ে ওই গাড়িতে ওঠো।’ আমি স্যারের আদেশ শুনে গাড়িতে গিয়ে উঠি এবং দেখতে পাই মেজর নওশাদ স্যার গাড়িতে বসা আছেন এবং দুজন আসামি (পরে বলেন) টার্গেট জমটুপি পরা অবস্থায় গাড়ির ভেতরে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর জিয়াউল আহসান স্যার রাস্তার অপর পার্শ্বের একটি প্রাইভেট কারে এসে নামেন। তারপর রাস্তা পার হয়ে আমাদের গাড়িতে এসে ওঠেন। আমরা যাত্রা শুরু করে টঙ্গী হয়ে আহসান উল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার হয়ে কাঁচপুর ব্রিজের ওপরে গিয়ে দাঁড়াই। তখন জিয়া স্যার আমাকে বলেন, ‘ইমরুল নামো।’ আমি স্যারের আদেশ অনুযায়ী গাড়ির পাশেই দাঁড়াই গার্ড দেওয়ার জন্য। তখন জিয়া স্যার একজন টার্গেটকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর দুটি গুলি করেন এবং ব্রিজ থেকে যখন ফেলে দেন, তখন টার্গেটের লুঙ্গি খুলে দেন। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেখান থেকে টার্গেটকে নদীর পানিতে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। তখন একইভাবে মেজর নওশাদ স্যার পরবর্তী টার্গেটকেও গুলি করে হত্যা করেন এবং লুঙ্গি খুলে পানিতে ফেলে দেন।”

‘এই ঘটনা ছাড়াও আমি বেশ কয়েকবার জিয়াউল আহসান স্যারের সঙ্গে বরিশালে গিয়েছিলাম এবং র‌্যাব-৮-এর সহযোগিতায় পাথরঘাটায় চরদুয়ানি বাজার থেকে বলেশ্বর নদীর ভেতরে সাগরের মোহনায় গিয়ে কখনো দুজন, কখনো তিনজন, কখনো চারজন টার্গেটকে পূর্বের ন্যায় হত্যা করে অর্থাৎ সিমেন্টের বস্তা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। বস্তা বেঁধে লাশ পানিতে ফেলার পূর্বে ওই টার্গেটগুলোর পেট কমান্ডো নাইফ দিয়ে চিরে ফেলা হতো।’

‘জিয়াউল আহসান স্যারের সঙ্গে আমি এক বছর তিন-চার মাস বডিগার্ড বা রানার হিসেবে থাকা অবস্থায় আমি লক্ষ করি যে, তিনি বিভিন্নভাবে আসামিকে গুম করতেন। তিনি র‌্যাব-১-এর টিএফআই সেল থেকে আসা ব্যক্তিদের বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করতেন। এই বিভিন্ন পন্থার মধ্যে ছিল গুলি এবং ইনজেকশন। পূর্বের বর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আরও ১০-১২ জন ব্যক্তিকে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করেছেন। এই ইনজেকশন প্রয়োগ করার কাজটি কখনো টিএফআই সেলের ভেতরে, কখনো গাড়িতে সংঘটিত হতো। আমি র‌্যাব থেকে চলে যাওয়ার পরে আগের মতো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি নাই (সাক্ষী এ পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন)। আমি দেশের জন্য শপথ গ্রহণ করেছি, প্রশিক্ষণও নিয়েছি; তবে তা কখনোই দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। আমি রানার হিসেবে তার সঙ্গে দেখেছি, তিনি ওই সময়ে ১৫০-২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করেছেন। আমি বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে জবানবন্দি প্রদান করেছি। আমি ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। কোনো সৈনিককে কখনোই যেন আমার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয়।’

সাক্ষ্যের শেষ পর্যায়ে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা একাধিকবার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। বর্তমানে আমি ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত। আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, এখন আমি নিরাপত্তা চাই।’

বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১২:০৬ এএম
বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা
পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে সড়ক, ছবিটি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাগলী বাজার থেকে তোলা। ছবি: খবরের কাগজ

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন জেলায় নদ-নদীর পানি বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে কোথাও সড়ক তলিয়ে যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও স্থানীয় অবকাঠামো। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সিলেটের সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

লালমনিরহাট: উজানের পাহাড়ি ঢল ও থেমে থেমে বৃষ্টিতে জেলার তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। রবিবার দুপুর ১২টা ও বেলা ৩টায় তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে তিস্তার নিম্নাঞ্চলে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম: তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার নিচ প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার অন্যান্য নদ-নদীর পানিও বাড়ছে। রবিবার সকালে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, আগামী পাঁচ দিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদের অববাহিকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

রংপুর: উজানের পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে জেলার গঙ্গাচড়ায় মহীপুর দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রায় ৮৫০ মিটার দীর্ঘ বাঁধের মধ্যে অন্তত ৬০ মিটার অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। এতে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু ও রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক হুমকির মুখে পড়েছে।

শনিবার তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে প্রবাহিত হওয়ায় ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ ৪৪টি কপাট খুলে দেয়। এতে কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ৪০০ পরিবার ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিপাতে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শনিবার দুপুরে পানির তীব্র স্রোতে সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের বাহুকা গ্রামে নদীর তীর রক্ষা বাঁধের ৩০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে ফসলি জমি ও বসতভিটা। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ভর্তি বালুর বস্তা ফেলছে।

সুনামগঞ্জ: কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীর পানি উপচে আনোয়ারপুর সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, আগামী তিন দিন ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সিলেট: দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। রবিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়া স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

তবে উজানে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় জেলার কয়েকটি নদীর পানি বাড়ছে। বিশেষ করে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ কারণে বন্যার শঙ্কা প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

রবিাবর সকাল ৯টা পর্যন্ত পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলার কোনো নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে সুরমা, কুশিয়ারা, গোয়াইন ও পিয়াইন নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি বাড়ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্ট। সেখানে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ মিটার হলেও সকাল ৯টায় পানির সমতল ছিল ১২ দশমিক ১৪ মিটার অর্থাৎ পানি বিপৎসীমার মাত্র ৬১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় কারাবন্দি বাংলাদেশিদের মুক্তিতে উদ্যোগের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ১১:০১ পিএম
মালয়েশিয়ায় কারাবন্দি বাংলাদেশিদের মুক্তিতে উদ্যোগের আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজিত মতবিনিময় সভায় যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রবিবার (২১ জুন) মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় রাত পৌনে ১১টায় কুয়ালালামপুরের হোটেল সাংগ্রিলায় এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

 এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।

এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মালয়েশিয়ায় বহু বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। অনেক প্রবাসী বিভিন্ন কারণে দেশটির কারাগারে আটকে আছেন, এ সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। কীভাবে তাদের মুক্ত করা যায়, সেই চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় যেন অদক্ষ শ্রমিক না আসে সেজন্য টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কার্যকর করা হবে। মালয়েশিয়ায় প্রবাসী শ্রমবাজার খুলে দিতে দেশটির সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা এবং মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এর আগে রবিবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পৌঁছান। সেখানে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এসএন/