শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদ থেকে আকস্মিক অবসর ঘোষণার পর অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি উপদেষ্টাকে নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার (২ মার্চ) রাতে বিশদ ব্যাখ্যায় নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
এতে বলা হয়েছে, সৈয়দ জামিল আহমেদের বক্তব্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের প্রতি কিছু অসত্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার বিষয়েও অসত্য, মনগড়া ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য রয়েছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমিতে একটি নাট্যোৎসব চলাকালীন আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণা দেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। এ সময় তিনি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ আনেন। পাশাপাশি সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ আনেন।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদে তাকে রাখতে হলে ৪টি শর্ত জুড়ে দেন তিনি। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিল্পকলা একাডেমি পরিচালনায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, শিল্পকলা একাডেমি তথা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট অন্তত ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার দাবি রয়েছে সেখানে।
সৈয়দ জামিল আহমেদের পদত্যাগের এ ঘটনা সংস্কৃতি অঙ্গণে আলোড়ন তুলে। সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হন সংস্কৃতি উপদেষ্টা।
এর একদিন পর উপদেষ্টা ফারুকী তার অবস্থান কিছুটা ব্যাখ্যা করেন। ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তিনি সৈয়দ জামিল আহমেদের বক্তব্যকে অসত্য বয়ান বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সৈয়দ জামিল আহমেদকে নিয়ে বিষোদগারও করেন।
রবিবার রাতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদলিপিতে সৈয়দ জামিল আহমেদের অভিযোগগুলোর প্রত্যুত্তর আসে।
জামিল আহমেদ অভিযোগ করেছিলেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে একটি ভিডিও নির্মাণের বিষয়ে চিঠিপত্র ছাড়া টাকা প্রদানের জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা। এ অভিযোগটি ‘সম্পূর্ণ অসত্য ও বানানো’ বলে দাবি করা হয় প্রতিবাদলিপিতে।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্যারিসে ইউনেসকোর সদর দপ্তরে গত ২১ ফেব্রুয়ারি একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয় বাংলাদেশ। ওই অনুষ্ঠানে মাতৃভাষা দিবসের ইতিহাস সংরক্ষণে বাংলাদেশের অবদান তুলে ধরে বিশেষভাবে নির্মিত একটি ১৫ মিনিটের ভিডিও এবং একটি লাইভ প্রোগ্রাম উপস্থাপন করা হয়।
ভিডিওটি নির্মাণের জন্য গত ২ ফেব্রুয়ারি শিল্পকলা একাডেমিকে চিঠি দেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
এতে বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের ৩৮ কোডের ‘সাংস্কৃতিক মঞ্জুরি- ৩৮২১১১৫’ খাত থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হবে। উন্নত কারিগরি সহায়তা এবং সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে ভিডিওটি নির্মাণের জন্য নিয়ম অনুযায়ী অগ্রিম কিছু টাকা নির্মাতাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বলছে, সৈয়দ জামিল আহমেদ অর্থ দেওয়া হবে না মর্মে সংস্কৃতি উপদেষ্টার অনুরোধ নাকচ করে দেন। তখন মন্ত্রণালয় থেকে বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালককে চিঠি দেওয়া হয়। তাই ‘চিঠি ছাড়া টাকা দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চাপ দেওয়া’ হয়েছে মর্মে সৈয়দ জামিল আহমেদের বক্তব্য ‘ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ।’
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বলছে, শিল্পকলা একাডেমির কোনো কাজে তারা হস্তক্ষেপ করেনি। মন্ত্রণালয় একাডেমির কোনো কাজ বন্ধ করতে বলেছে এরকম কোনো নজির নেই। বরং সব সময় শিল্পকলার কাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে দুস্থ, অসহায় বাউল শিল্পীদের নিয়ে সাধুমেলা আয়োজন করতে শিল্পকলা একাডেমিকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের দাবি করছে মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া ‘রিমেম্বারিং জুলাই রেভ্যুলেশন’ নামে ৮ বিভাগে প্রোডাকশন ওরিয়েন্টেড ফিল্ম মেকিং ওয়ার্কশপ, ৮টি নতুন থিয়েটার ও একটি গেরিলা বা ইনভিজিবল থিয়েটার নির্মাণের বিষয়েও মন্ত্রণালয় থেকে শিল্পকলা একাডেমিকে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবাদলিপিতে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বলছে, বিভিন্ন কর্মসূচিতে শিল্পকলা একাডেমির অনুরোধে মন্ত্রণালয় থেকে সাধারণ বাজেটের বাইরেও বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শিল্পকলা একাডেমিকে আন্তরিক সহযোগিতা দেওয়া ছাড়া কোনো রকম হস্তক্ষেপের নজির নেই। তাই যা তিনি (সৈয়দ জামিল) বলেছেন তা অসত্য, তার মনগড়া।
অর্থ বিভাগে বাজেট সংক্রান্ত এক সভায় শিল্পকলা একাডেমির কাঙ্ক্ষিত বাজেট কর্তনের অভিযোগ এনেছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় বলছে, অর্থনৈতিক মন্দা ও সীমাবদ্ধতার জন্য আসন্ন অর্থবছরে বাজেট সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয় ওই সভায়। তবে শিল্পকলা একাডেমিতে আলাদা প্রকল্প নেওয়া হলে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি আসে ওই সভাতে। তাই সৈয়দ জামিলের অভিযোগ ‘নিতান্তই অমূলক ও প্রশাসনিক অদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ।’
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি একুশে পদক বিতরণ অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত মহড়া অনুষ্ঠানে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও আবহ সংগীত পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ‘আটকে রেখেছিলেন’ বলে অভিযোগ এনেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ১২৫তম পরিষদ সভার কার্যবিবরণীতে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে অসঙ্গতি ছিল বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। তাই তা সংশোধন করতে ফের শিল্পকলা একাডেমিতে যথাসময়ে পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করছে তারা। তারা বলছে, কালক্ষেপণের অভিযোগ সত্য নয়।
এদিকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি মহাপরিচালক পদে সৈয়দ জামিল আহমেদকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে মানববন্ধন করেছে ‘বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-শিল্পী-নাগরিক সমাজ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম।
রবিবার বিকেলে সেগুনবাগিচায় জাতীয় নাট্যশালার সামনে ‘গণ-অভ্যুত্থানের গণআকাঙ্ক্ষা, আমলাতন্ত্রের সঙ্গে আপস না’ শিরোনামে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
জয়ন্ত/সালমান/