আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে আংশিক বই দিয়ে ‘বই উৎসব’ করার চেনা সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় সব শ্রেণির শতভাগ পরিমার্জিত বই পৌঁছে দেওয়ার রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। যাতে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই চার কোটি শিক্ষার্থী নতুন বই হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এনসিটিবির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা এসব তথ্য জানান।
বছরের শুরুতে আংশিক বই বিতরণের প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসা প্রসঙ্গে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগে মোট বইয়ের ৫০ বা ৬০ শতাংশ সরবরাহের একটি প্রথা ছিল। ফলে বড় বড় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে বই সরবরাহ করে মোটের ওপর ৫০ শতাংশের কোটা পূরণ করত।
কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক উপজেলা সময়মতো পাঠ্যবই পেত না। এবার আমরা প্রেস মালিকদের স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি সব শ্রেণির ৫০ শতাংশ বই প্রত্যেক উপজেলায় আগে পৌঁছাতে হবে। এরপর বাকি ৫০ শতাংশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ বই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য মুদ্রণকারীদের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রথম টার্গেট হল যেহেতু ডিসেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়, তাই ১৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বরের ছুটিকালীন সময়েই যেন তারা হাতে নতুন বই নিয়ে যেতে পারে। এটি সফল না হলে দ্বিতীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী আগমী বছর ১ জানুয়ারির মধ্যে সব বই বিতরণ সম্পন্ন করা হবে। নতুন ক্লাসে ওঠা এবং নতুন বই পাওয়াটাই শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় উৎসব বলে আমরা মনে করি।’
প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের জন্য মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হবে। দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মুদ্রণকারীদের গাফিলতি ও কাগজের কৃত্রিম সংকট মোকাবিলা প্রসঙ্গে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বই ছাপার কাজ শুরু হলে বাজারে হঠাৎ কাগজের দাম বাড়িয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির একটা অপচেষ্টা অতীতে দেখা গেছে। এবার আমরা আগে থেকেই পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি।
শিক্ষাকে আনন্দময় করতে নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে কিছু বৈচিত্র্যময় বই যুক্ত হচ্ছে জানিয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যেন তাত্ত্বিক পড়াশোনার বাইরে গিয়ে আনন্দ পায় এবং মোবাইল বা ফেসবুক আসক্তি থেকে দূরে থাকে, সেই লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে তিনটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সাতটি খেলা (ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স ও কারাতে) অন্তর্ভুক্ত করে নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, এছাড়া ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিখন ও সংস্কৃতির বই এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা (টিভিইটি) বিষয়ক উদ্দীপনামূলক ১টি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ চলছে। এগুলো যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেজন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)সহ শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করছি, যাতে শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনার মাধ্যমে বাস্তব রূপায়ন নিশ্চিত করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী দেশে কারিগরি শিক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। দেশের বেকারত্বের হার কমাতে শিক্ষিত যুবসমাজকে কর্মমুখী করাই এই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর বিশেষ কনটেন্ট ও মোটিভেশনাল সাকসেস স্টোরি যুক্ত হচ্ছে, যা আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীরা বইয়ে পাবে।
আর ২০২৮ সালে যখন পূর্ণাঙ্গ নতুন কারিকুলাম আসবে, তখন কারিগরি শিক্ষাকে আরও বড়, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানদ-ে কার্যকরী পরিসরে পরিমার্জন করে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
আমান/