সরকারি অফিসে সেবা পেতে ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ নাগরিক ঘুষ বা দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। ২১টি সরকারি অফিসের মধ্যে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বিআরটিএ, দ্বিতীয় অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তৃতীয় অবস্থানে পাসপোর্ট অফিস।
বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
এ উপলক্ষে আগারগাঁও পরিসংখ্যান ভবনে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিবিএস।
এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘অন্য জায়গার মতো শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও প্রচুর ঘুষ লেনদেন হয়।’
বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার, পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. কাইয়ুম আরা বেগম। এই জরিপ প্রতিবেদনটিতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক রাশেদ-ই-মাসতাহাব। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৬৪ জেলার প্রায় ৪৬ হাজার খানায় তথ্য সংগ্রহ করে এই জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
বিবিএসের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নাগরিকদের সর্বাধিক ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বিআরটিএ। সেখানে সেবা নিতে গিয়ে ৬৩ দশমিক ২৯ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় ৬১ দশমিক ৯৪ শতাংশ, পাসপোর্ট অফিসে ৫৭ দশমিল ৪৫ শতাংশ ও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে ৫৪ দশমিক ৯২ শতাংশ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুই বছরে ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ নাগরিক কোনো না কোনো বিবাদ বা বিরোধের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ নাগরিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পেয়েছেন। এর মধ্যে ৪১ দশমিক ৩৪ শতাংশ আনুষ্ঠানিক (আদালত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং ৬৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক (কমিউনিটি নেতা, আইনজীবী ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, গত ১ বছরে দেশের ১৯ দশমিক ৩১ শতাংশ জনগণ কোনো না কোনো ধরনের বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। নারীদের মধ্যে এই হার কিছুটা বেশি, যা ১৯ দশমিক ৬২ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের মধ্যে তা ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলে বৈষম্যের হার ২২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলের (১৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ) তুলনায় বেশি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নিজের খানাতেই (পরিবার) বৈষম্য ও হয়রানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ৪৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ, গণপরিবহন ও উন্মুক্ত স্থানে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশ, কর্মস্থলে প্রায় ২৬ শতাংশ, দোকান, ব্যাংক রেস্টুরেন্ট, নাইট ক্লাব ও হোটেলে ২৩ শতাংশ। এভাবে ১২টি স্থানে নাগরিকদের বৈষম্য ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জীবনমানের গুণগত মান প্রভাবিত করে। নিজ বাড়িতে ৮৫ শতাংশ মানুষ নিরাপদ মানে ১৫ শতাংশ অনিরাপদ। এটা কোনো সভ্য দেশে গ্রহণযোগ্য নয়। নিজের বাড়িতে ১০ শতাংশ মানুষও যদি নিরাপদ নয় মনে করলে তা উদ্বেগজনক।
ঘুষ-দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিম্নবিত্তের চেয়ে উচ্চবিত্ত পরিবারে বেশি লেনদেন হয়। তাড়াতাড়ি সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ লেনদেন হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা খাত উল্লেখ করা না হলেও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দেখেছি প্রচুর ঘুষ লেনদেন হয়।
গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তা ধরা হয়েছে। বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীরা এ কাজে জড়িত। পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, বিআরটিএ অফিস অনলাইন হলেও ঘুষের লেনদেন হচ্ছে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কেরানির ড্রয়ার থাকে। তারা সেখানেই টাকা রাখানে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অফিসারদের তা দেখা দরকার।’