পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রায় ৬ বছর পর রবিবার (২২ জুন) বিকেল ৪টা থেকে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে।
এই পাইপলাইন দিয়ে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে ঢাকার নারায়ণগঞ্জের ডিপোতে পাঠানো হচ্ছে ৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল। ঘণ্টায় সরবরাহ করা হচ্ছে ৩০০ মেট্রিক টন। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সহযোগী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েলকে এই পাইপলাইন দিয়ে তেল সরবরাহ করা হবে।
ঢাকায় পাইপলাইনে তেল সরবরাহের মাধ্যমে বিপুল টাকার পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি সময়েরও সাশ্রয় হবে। তেল চুরিসহ সিস্টেম লসের কবল থেকে বহুলাংশে মুক্তি মিলবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিপিসির কর্মকর্তারা।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মনি লাল দাশ (বাণিজ্য ও অপারেশন) খবরের কাগজকে বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু হয়েছে। গতকাল বিকেলে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের ডিপোতে পাঠানো হয়েছে তেল। সুতরাং বলা যায়, গতকাল থেকে শুরু হয়ে গেছে পাইপলাইনে তেল সরবরাহ।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে ২ হাজার ৮৬১ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহীত প্রকল্পটির আওতায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর এবং মুন্সীগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদলাইন ও ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতা এবং করোনাকালে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্প ব্যয়ও অনেক বেড়ে যায়। জমি অধিগ্রহণ খরচও বাড়ে। ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এবার ৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হলো।
চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্পের পরিচালক আমিনুল হক খবরের কাগজকে বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকায় তেল সরবরাহ শুরু দেশের জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। এতে দেশের অর্থ সাশ্রয় ও সময় বাঁচবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ঝুঁকিমুক্ত হলো সেক্টরটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিশ্বের নানা দেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল চট্টগ্রামে খালাস করা হয়। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পর পরিশোধন করা হয় একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। এ ছাড়া আমদানি করা পরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি অংশ প্রাথমিক অবস্থায় মজুত রাখা হয় চট্টগ্রামের বিভিন্ন ডিপোতে। সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে লরিযোগে (ভাউসার) সরবরাহ করা হতো জ্বালানি তেল। ফলে জ্বালানি তেল পরিবহনে অপচয় কমানো আর সময় বাঁচাতে ২০১৮ সালে শুরু হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্পের কাজ।
সূত্র জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। এই তেলের ৪০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক, নৌ ও রেলপথে জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। পরিবহনকালে বিভিন্ন সময় লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া যেত। নৌপথে জ্বালানি তেল পরিবহনকালে তেল চুরি করে সাগরের পানিতে মিশিয়ে দেওয়ার অভিযোগও বহু পুরোনো। সড়ক ও রেলপথেও ঘাটে ঘাটে তেল চুরির সচিত্র বহু সংবাদ বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সিস্টেম লসের নামে এসব চুরি এবং লোপাটের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কোটি কোটি টাকার ক্ষতির কবলে পড়ে।
বিপিসির দাবি, এই পাইপলাইন দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ শুরু হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা খাতে বড় ধরনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেল।