জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ আরও ১ মাস বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এই কমিশনের মেয়াদ বাড়িয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।
সোমবার (১১ আগস্ট) মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ থেকে এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মতভিন্নতা কাটতে আরও এক দফা আলোচনার মাধ্যমে সনদের চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ আরও এক মাস বাড়ানো হতে পারে, বিভিন্ন সূত্রে এমন আভাস পাওয়া গিয়েছিল।
এর আগে রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দু’দফা বৈঠক করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গত ৩১ জুলাই জুলাই জাতীয় সনদের প্রাথমিক খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়। তবে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
দু’দফায় ৬৮টি বৈঠকে দলগুলোর মধ্যে অন্তত ৮১টি ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে কমিশন। তার মধ্যে প্রথম দফায় ঐকমত্য ৬২টিতে আর দ্বিতীয় দফায় ১৯টি মৌলিক ইস্যু। এর মধ্যে ঐকমত্য হয় ৯টি বিষয়ে। আর ১০টি বিষয়ের ক্ষেত্রে এক বা একাধিক দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) রয়েছে। এছাড়াও কমিশন বৈঠকে আরও ৫-৬টি বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যায়ে সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সই আদায় এবং সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণে রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। শনিবার (৯ আগস্ট) থেকে ৩য় দফা এই বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এবারের বৈঠক শেষ করে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ ৩০ দিন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আগের দু’দফা বৈঠক এবং জুলাই জাতীয় সনদ প্রনয়ণের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানাতে শুক্রবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার এলডি হলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
এর আগে ৩ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ঐকমত্য কমিশন কার্যালয়ে পর্যালোচনা সভা করে ঐকমত্য কমিশন। সভায় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন। পরে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক দল ও জোট এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আরও মতামত নিতে তৃতীয় দফা বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পর্বের আইনজ্ঞ, সংবিধানবিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কমিশন ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করবে। এতে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ ও সনদে দলগুলোর স্বাক্ষর নেওয়ার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে কমিশন পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে আবারও আলোচনা করবে। কারণ ১০টি ইস্যুতে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট)সহ পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সনদ তৈরি, সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সই আদায় এবং ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ।
ঐকমত্য কমিশন সূত্র জানায়, তৃতীয় পর্বের আলোচনার শুরুতে থাকবে সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ। এর আগে দুই পর্বে একমত হওয়া বিষয়গুলোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ঠিক করা হবে। কোন কোন প্রস্তাব বা সুপারিশ অধ্যাদেশ জারি করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সে বিষয়ে আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা এটি যাচাই-বাছাই করবেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় নিয়েও আলোচনা হবে। আর যেসব প্রস্তাবের বাস্তবায়ন সংবিধান সংশোধন ছাড়া সম্ভব নয়, সেগুলোর বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে। যেসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনো কোনো দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) আছে, সেগুলোর বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হবে। ভিন্নমত কমিয়ে আনার চেষ্টাও করা হবে এ পর্বের আলোচনায়।
গত বছরের অক্টোবরে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ফেব্রুয়ারিতে কমিশনগুলো প্রতিবেদন দেয়। পরে সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। এরপর ৬টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করে ঐকমত্য কমিশন। এর মধ্যে আইনবিধি সংস্কার করে বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন সম্ভব, এমন অনেক সুপারিশকে ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে। অন্যদিকে ১৬৬টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্য কমিশন। এসব বিষয়ে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত জানতে চায় ঐকমত্য কমিশন। তাদের মধ্যে ৩৩টি দল তাদের মতামত দেয়।
প্রথম ধাপে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার এলডি হলে ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক। গত ৩১ জুলাই ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয় এসব অধিবেশনে দলগুলোর মধ্যে ৬২টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ২০টি মৌলিক ইস্যুতে কমিশনের অধিবেশন হয় ২৩টি। গত ২ জুন প্রধান উপদেষ্টা ও ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি মুহাম্মদ ইউনূস এ পর্বের আলোচনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ৩ জুন থেকে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা হয়। এতে মৌলিক সংস্কারের ১৯টিতে ঐকমত্য এবং ১০টি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ৩১ জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকের সমাপ্তি ঘটে।
এলিস/অমিয়/