সত্য ও সুন্দর কর্মপদ্ধতি বরণ করে পৃথিবীকে শান্তিময় করে তোলার প্রতিজ্ঞায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আজ ৬ অক্টোবর উদযাপন করবেন তাদের দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। প্রবারণা হলো আত্মশুদ্ধি ও অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণের অনুষ্ঠান।
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধ নির্বাণ লাভের পর আষাঢ়ি পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথি পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাবাস করেন। বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা উৎসব পালন করেন তিনি। তখন থেকেই বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুরা বর্ষাবাস শেষে দিনটি পালন করে আসছেন।
বৌদ্ধদের বিশ্বাস, প্রবারণা পূর্ণিমায় ভগবান বুদ্ধ ‘তাবতিংস’ স্বর্গে মাকে ধর্মদেশনা দেওয়ার পর সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন। এই দিনে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পৃথিবীর কল্যাণকর কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হতে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দেন।
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আজ দিনব্যাপী দেশের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু হয় ভোর থেকে। এর মধ্যে রয়েছে বুদ্ধ পতাকা উত্তোলন, ভিক্ষু সংঘের পিণ্ডদান ও প্রাতঃরাশ, মঙ্গলসূত্র পাঠ, বুদ্ধ পূজা, পঞ্চশীল প্রার্থনা, মহাসংঘ দান, ধর্মীয় দেশনা প্রদান, প্রদীপ পূজা, হাজার বাতি দান, ফানুস ওড়ানোসহ বিভিন্ন দান অনুষ্ঠান। এসব অনুষ্ঠানে হাজারও পুর্ণার্থী উপস্থিত থেকে দেশ ও জাতির কল্যাণে প্রার্থনায় অংশ নেন।
প্রবারণা পূর্ণিমার আকর্ষণীয় একটি দিক হলো সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানোর উৎসব। আজ সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের অধিকাংশ বিহারেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফানুস ওড়াবেন। ফানুস মূলত ওড়ানো হয় বুদ্ধের কেশ ধাতুর প্রতি পূজা ও সম্মান প্রদর্শন করতে। কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ যখন সন্ন্যাসযাত্রা করেন, তখন তিনি নিজের চুলের কয়গাছি কেটে রাজমুকুটসহ আকাশের দিকে নিক্ষেপ করেন। ‘তাবতিংস’ স্বর্গের দেবতারা তার কেশরাশি নিয়ে ‘চুলমনি চৈত্য’ প্রতিষ্ঠা করে পূজা করতে লাগলেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই সশ্রদ্ধচিত্তে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উড়িয়ে থাকেন।
প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে দেশের প্রতিটি বৌদ্ধ বিহারে শুরু হবে কঠিন চীবর দান উৎসব। এ উৎসবে পুণ্যের আশায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ভিক্ষুসংঘকে ত্রি-চীবর (বিশেষ পোশাক) বা চার খণ্ডের পরিধেয় বস্ত্র দান করবেন। যাতে রয়েছে দোয়াজিক, অন্তর্বাস, চীবর ও কটিবন্ধনী এবং অন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বৌদ্ধ ধর্মমতে, কঠিন চীবর দান হলো শ্রেষ্ঠ দান। এর মাধ্যমে অর্জিত পুণ্য পরবর্তী জীবনেও সুফল দান করে ও নির্বাণ লাভের পথ প্রশস্ত করে।
প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আজ রাজধানীর মেরুল-বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার ও বাসাবোর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে দিনভর রয়েছে নানা আয়োজন। বিকেল ৪টায় প্রবারণার তাৎপর্য ও বিশ্ব মানবতাবাদ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
রাঙামাটির রাজবন বিহারে বড় আয়োজন
প্রবারণা পূর্ণিমায় বড় আয়োজন রয়েছে রাঙামাটি শহরের রাজবন বিহারে। প্রতিবছর সেখানে পুণ্যার্থীর ঢল নামে। এ ছাড়া শহরের তবলছড়ি এলাকার আনন্দ বিহার, আসামবস্তির বুদ্ধাংকুর বৌদ্ধ বিহার, ধর্মচক্র বৌদ্ধ বিহারসহ পাহাড়ে অবস্থিত বিহারগুলোতেও পুর্ণার্থীর ব্যাপক সমাগম হয়।
আসামবস্তি ধর্মচক্র বৌদ্ধ বিহারের আবাসিক প্রধান ওয়ারাসামি থেরো বলেন, ‘বিশ্ব শান্তি, সমৃদ্ধি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস ও কল্যাণ কামনা করে প্রার্থনা করব আমরা।’