খয়ের রঙের ফুলহাতা শার্ট ও লুঙ্গি পড়া একজন ব্যক্তি হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ছলছল চোখে চেয়ে রয়েছেন। চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ, ঘামে ভিজে চেহারা চকচক করছিল। হাত টেনে কিছুক্ষণ পরপর মুখ ও কপালের ঘাম মুছছিলেন। একটু পড়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন তিনি। বলছিলেন, ‘‘মৌসুমি মারে তুই কই গেলি। সকালে আমারে ভাত দিলি, কাজে গেলি, আর দেখা নাই। কই খুঁজি আমার মাইয়াডারে। পোড়া লাশগুলাও দেখতে দিল না।’’ এসময় তার পাশে থাকা দুইজন শান্তনা দিচ্ছিলেন।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ফুপিয়ে কেঁদে এসব বলছিলেন আব্দুল মান্নান।
দুপুরে রাজধানীর রুপনগর শিয়ালবাড়ি আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল গোডাউন ও পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ তার মেয়ে মৌসুমি আক্তারের (১৮) হদিস পেতে এসেছিলেন তিনি। নিখোঁজ মৌসুমি একটি টিশার্ট তৈরির কারখানায় কাজ করতেন।
এই ঘটনায় গতকাল রাত ১১টা পর্যন্ত কেমিক্যালের আগুনে ঝঁলসে যাওয়া ১৬ জনের মরদেহ ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। ওই মরদেহের সারিতে তার মেয়ে রয়েছে কি না তা জানতেই অপেক্ষা করছিলেন রিকশা চালক বাবা আব্দুল মান্নান। তার মতো ঢামেক হাসপাতালে জরুরি বিভাগের সামনে ৮ জন নিখোঁজের স্বজনরা অপেক্ষা ছিলেন।
জানতে চাইলে আব্দুল মান্নান খবরের কাগজকে বলেন, ‘‘সোমবার রাতে বাসায় গিয়ে কয়টা ময়লা কাপড় রাখছিলাম। পরের সকালে (মঙ্গলবার) আমার মেয়ে (মৌসুমি) সেগুলো ধুইয়া দিছে। আমার ভাত বাইরা দিয়া সেও নাস্তা খাইয়া কাজে গেল। সঙ্গে দুপুরের খাওনও নিয়া গেছিল। পরে আমি রিকশা চালাইতে যাই। আগুনের খবর পাইয়া দ্রুত সেখানে গেছিলাম। কিন্তু আমার মেয়েকে আর খুঁজে পাইলাম না। অক্টোবরের ১ তারিখে সে গেঞ্জির কারখানায় কাজে ঢুকছিল৷ আগে পাশের গলিতে অন্য একটা কারখানায় কাজ করতো।’’
তিনি জানান, পরিবারে তিন মেয়ে এক ছেলে। সবাই লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা গ্রামের বাড়িতে থাকলে। তবে মেজো মেয়ে মৌসুমি তার সঙ্গে রুপনগরের শিয়ালবাড়ি আবাসিক এলাকার ২৭ নম্বর রোডের ভাড়া বাড়িতে থাকতেন।
ছোট ভাই রবিন মিয়ার (১৯) সন্ধানে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষা করছিলেন তাজুল ইসলাম। এছাড়াও গার্মেন্টস কর্মী ফারজানা আক্তারের সন্ধানেও এসেছিলেন তার চাচা মো. জামাল। তারা অপেক্ষায় ছিলেন ঢামেকে আনা ১৬ মরদেহ দেখতে, সেখানে তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনরা রয়েছেন কি না। তবে আগুনে মরদেহগুলো ঝঁলসে যাওয়ায় এবং ডিএনএ আলামত সংরক্ষণের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কাউকে মরদেহ দেখার সুযোগ দেননি।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. মো. মোস্তাক আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, মঙ্গলবার সাড়ে ৮টার দিকে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স যোগে ১৬টি মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে ৯জন পুরুষ ও ৭ জন নারী। তাদের শরীরে বেশিরভাগই পুরে গেছে। আজ বুধবার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। মরদেহগুলো হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী খুব দ্রুতই মরদেহগুলো তাদের স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
এর আগে, আগুনের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ১৬টি মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। এই ঘটনায় ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
শেখ জাহাঙ্গীর আলম/মাহফুজ