দেশের নদ-নদীর নাব্যতা সংকট নিরসনের জন্য চারটি নতুন হাই ফ্রিকোয়েন্সি ড্রেজার মেশিন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন।
শনিবার (৮ নভেম্বর) দুপুরে মানিকগঞ্জের আরিচায় যমুনা নদীতে বিআইডব্লিউটিএর নতুন ড্রেজার ‘আন্দারমানিক-১’ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, এই ড্রেজারগুলো অনেক গভীরে কাটতে সক্ষম। এগুলো সম্প্রতি নামানো হয়েছে এবং তৈরি হয়েছে আমাদের দেশেই। যদিও প্রযুক্তি বিদেশি, কিন্তু সম্পূর্ণ কাঠামো সংযোজিত হয়েছে দেশীয় কারিগরি সক্ষমতায়।
উপদেষ্টা আরও জানান, চারটি ড্রেজার তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। অথচ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলে এ ব্যয় দাঁড়াত সাতশ থেকে আটশ কোটি টাকায়। এতে দেশের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি স্থানীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের অভিজ্ঞতাও বেড়েছে।
ড্রেজিং করা বালুর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বলেন, দেশে জায়গা সীমিত—সব জায়গায় ড্রেজিং করা বালু সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি ড্রেজারের সঙ্গে একটি করে ডাম্পবার্জ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বালুগুলো বার্জে সংরক্ষণ করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা যায়। এই পরিকল্পনাকে পরবর্তী প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর এখনো পুরোপুরি আধুনিক নয়। আধুনিকায়ন ও বিনিয়োগ বাড়াতে বিদেশি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এটি ছাড়া কার্যক্রম ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, যাদের ব্যক্তিস্বার্থে আঘাত লাগে তারাই সমালোচনা করেন যে আমরা বিদেশিদের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর হস্তান্তর করছি। বাস্তবে তা নয়। গার্মেন্টসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি কোম্পানি কাজ করছে। বিশ্বের অনেক দেশেই বন্দর বিদেশি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয় এবং এতে তারা আরও বেশি লাভবান হচ্ছে।
নগরবাড়ি নদীবন্দর প্রসঙ্গে ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এই বন্দরের সুফল স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে সুযোগ হলে এখানে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে—এটিও আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
নৌ পুলিশকে হাই-স্পিড বোট দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নৌ পুলিশকে হাই-স্পিড বোট সরবরাহের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে একটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অনুমোদন পেলে আমরা হয় বিদেশ থেকে কিনব, না হয় দেশেই তৈরি করব।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, নগরবাড়ি ঘাট নদীপথে সার, সিমেন্ট, কয়লা ও অন্যান্য ভারী পণ্য পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০১৮ সালে এই ঘাটকে আধুনিক নৌবন্দরে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা ও মামলার কারণে দুই দফা মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও অবশেষে নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
৩৬ একর জমির ওপর নির্মিত বন্দরে রয়েছে ৩৬০ মিটার দীর্ঘ কংক্রিট জেটি, টার্মিনাল, গুদাম, ওয়্যারহাউস, ওপেন শেড এবং দ্রুত পণ্য ওঠানো-নামানোর সুবিধা। ক্রেন ও পাকা জেটি ব্যবহারের ফলে পণ্য খালাসের গতি বেড়েছে ১০ গুণ। আগে যেখানে প্রতিদিন ২ হাজার টন পণ্য খালাস করা হতো, এখন তা ২০ হাজার টন পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, আগে সনাতন পদ্ধতিতে মালামাল ওঠানো-নামানো হতো, ফলে আমদানি কার্যক্রমে গতি ছিল না। এখন চিত্র বদলেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি জাহাজে করে নগরবাড়ি ঘাটে পণ্য আসছে এবং এখান থেকে তা সড়কপথে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে সহজে পৌঁছানো যাচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমছে।
বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব দেলোয়ারা বেগম, মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
আসাদ/মেহেদী/