২০২৫ সালের শেষ বিকেল। দিগন্তে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে বছরের শেষ সূর্য। সেই মুহূর্তটিকে ধারণ করতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেছেন পর্যটকরা। শীতের হিমেল হাওয়া আর নীল সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে সূর্যাস্তের লালচে আলো সব মিলিয়ে সৈকত পরিণত হয় এক আনন্দঘন মিলনস্থলে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা ভিড় করেছেন সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণীতে। কেউ ক্যামেরায় বন্দি করছেন শেষ সূর্যাস্ত, কেউবা প্রিয়জনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে নীরবে বিদায় জানাচ্ছেন পুরোনো বছরকে। পরিবার-পরিজন নিয়েও অনেককে দেখা গেছে সৈকতে।
পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আতশবাজি বা উচ্চ শব্দের আয়োজন না থাকলেও বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখাটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ঢাকার বনশ্রী থেকে আসা পর্যটক সোহানুল ইসলাম বলেন, ‘সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যকে বিদায় জানানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’
দিনার মাহমুদ বলেন, ‘সারা বছর কাজের চাপে সময়ই পাই না। বছরের শেষ সূর্যাস্তটা সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে দেখার জন্যই কক্সবাজারে আসা। সূর্য ডোবার এই মুহূর্তটা সত্যিই অন্য রকম শান্তি দেয়।’
কুমিল্লা থেকে আসা কলেজছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে বছরের শেষ বিকেলটা সমুদ্রের সামনে কাটানো আমার কাছে স্বপ্নের মতো। আতশবাজি না থাকলেও এই সূর্যাস্তই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদযাপন।’
রাজশাহী থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক আবদুল মুবীন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বছরের শেষ সূর্যাস্ত কক্সবাজারে দেখার ইচ্ছে ছিল। আজ পরিবার নিয়ে এসে সেই ইচ্ছা পূরণ হলো। শিশুদের নিয়ে নিরাপদ পরিবেশে থাকতে পারছি, এটাই সবচেয়ে ভালো লাগছে।’
সিলেট থেকে আসা তরুণ পর্যটক জয়নাল হোসেন বলেন, ‘আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি শুধু শেষ সূর্যাস্তটা চোখে দেখার জন্য। সমুদ্রের ঢেউ আর লালচে আকাশ এই দৃশ্য জীবনে একবার হলেও দেখা উচিত।’
তবে এ বছর থার্টি ফার্স্ট নাইটে কক্সবাজারে কোনো আয়োজন নেই। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের নেতৃত্বে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সৈকত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল ও নজরদারি।
নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো আয়োজন না থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত পর্যটকদের নিরাপত্তায় কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের প্রধান ও অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘থার্টি ফার্স্ট নাইটকে ঘিরে কক্সবাজারে কোনো আয়োজন নেই। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গভীর রাত পর্যন্ত বিশেষ নজরদারি অব্যাহত থাকবে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, সমুদ্রসৈকত, হোটেল জোনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।’
বছরের শেষ দিনটিকে ঘিরে ৭ দফা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সৈকত ও শহর এলাকায় আতশবাজি, পটকা ফোটানো এবং ফানুস ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব সামগ্রীর বিক্রি ও বিপণনও বন্ধ থাকবে। কোনো কনসার্ট, নাচ কিংবা গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে না। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টা থেকে ১ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সব বার ও মদের দোকান বন্ধ রাখাসহ ৭ দফা বিধিনিষেধ মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তার মাঝেই সূর্যাস্তের নীরব বিদায়
সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতে নেমে আসে একধরনের নীরবতা। আলো-আতশবাজি নয়, বরং শৃঙ্খলা আর নিরাপত্তার মধ্যেই কক্সবাজারে বিদায় দেওয়া হয় ২০২৫ সালকে।
দর্শনার্থীরা জানান, সমুদ্রের ঢেউ আর শেষ সূর্যাস্তের রঙে মোড়া এই বিকেল অনেকের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।