আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক জরিপে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইসির জরিপে বলা হচ্ছে, এই তিন নির্বাচনে ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোটার ভোট দেননি। একই সঙ্গে জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি ভোটার জানিয়েছেন তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগেই তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছেন।
একটি তদন্ত কমিশন জরিপটি পরিচালনা করে। তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হাইকোর্টের সাবেক বিচারক শামীম হাসনাইনকে প্রধান করে কমিশনটি গঠন করা হয়। কমিশন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে একটি প্রশ্নমালা প্রকাশ করে সাধারণ ভোটারদের মতামত সংগ্রহ করে। পরে কমিশন তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উপস্থাপন করে। প্রতিবেদনে জরিপের সমন্বিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
জরিপের সার্বিক ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোট না দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ভোটাররা নির্বাচনব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাহীনতার কথা বলেছেন। পাশাপাশি বড় একটি অংশ সরাসরি অভিযোগ করেছে, তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে।
নবম সংসদ নির্বাচন: আস্থাহীনতার শুরু
২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত এই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশ জানান, তারা ওই নির্বাচনে ভোট দেননি। ভোট না দেওয়ার কারণ হিসেবে ২৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ বলেন তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়েছিল। আর ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ জানান, নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর তাদের কোনো আস্থা ছিল না।
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ৮৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেন, নির্বাচন একদমই অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ৮৭ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ৮৪ দশমিক ০৫ শতাংশ ভোটার নেতিবাচক মত দিয়েছেন। ভোটদানের পরিবেশ সম্পর্কে প্রশ্নে অনেকে জানান, সহিংসতা ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে ভোট দিতে সমস্যা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভোট দিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।
একাদশ সংসদ নির্বাচন: অভিযোগ বেশি
২০১৮ সালের এই নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে ৮৪ শতাংশ ভোটার ‘না’ সূচক উত্তর দেন। ভোট না দেওয়ার কারণ হিসেবে ৪৫ শতাংশ জানান তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে। ৩২ শতাংশ বলেন, নির্বাচনব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা ছিল না।
এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে ৯০ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোটার বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ৯৩ শতাংশ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ৯০ দশমিক ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা নেতিবাচক মত দেন। অনিয়ম দূর করতে কী করা প্রয়োজন– এমন প্রশ্নে ৭১ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোটার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি নির্বাচন প্রভাবিত করা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: অনাস্থার চূড়ান্ত রূপ
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জরিপে দেখা যায়, ৮৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি। ভোট না দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ৫৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ বলেন, তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছেন। আর ৩০ দশমিক ১৬ শতাংশ জানান, নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা ছিল না।
ওই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে ৯২ শতাংশ ভোটার এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে একই সংখ্যক উত্তরদাতা ‘একদমই নিরপেক্ষ ছিল না’ বলে মত দেন। অনিয়ম দূর করতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার, নির্বাচনি আইনের সংস্কার, অনিয়মের সঠিক তদন্ত ও বিচার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের মতো সুপারিশ উঠে এসেছে।