মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জাতীয় নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারকে ব্যাপক মানবাধিকার সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি, সংখ্যালঘু সুরক্ষার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে।
গত সোমবার নিজ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওই বিষয়গুলো তুলে ধরে সংস্থাটি। মতপ্রকাশ ও মতামতের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টি জানায়, সীমাবদ্ধতামূলক আইন ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার রক্ষাকারীদের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। তারা মানহানি ও ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এমন ধারাগুলো বাতিল করতে সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর হামলাসহ গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সংঘটিত দলবদ্ধ হামলার তদন্ত করতে হবে।
বছরের পর বছর রাজনীতিকীকরণে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটি ২০২৪ সালের বিক্ষোভ চলাকালে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত দাবি করেছে। অ্যামনেস্টি ঢাকাকে জাতিসংঘের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ২০২৪ সালের বিক্ষোভসংক্রান্ত মামলাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠাতে হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকদের দেশ সফরের অনুমতি দিতে হবে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিষয়ে কথা বলার সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এখনো প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে এবং তারা সংস্কার প্রক্রিয়ায় খুব কমই অন্তর্ভুক্ত হয়।
অ্যামনেস্টি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার তদন্ত দাবি করেছে, যার মধ্যে হিন্দু শ্রমিকদের পিটিয়ে হত্যা ও হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও রয়েছে। পাশাপাশি বম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্বিচার লক্ষ্যবস্তুকরণের অবসান চেয়েছে তারা। সরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথাও বলেছে।
বাংলাদেশে নারীরা এখনো উচ্চমাত্রার সহিংসতার মুখে রয়েছেন ও রাজনীতিতে বঞ্চনার শিকার বলে মন্তব্য করেছে অ্যামনেস্টি। এমনকি ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলই যে একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি, সে বিষয়টিও সংস্থাটি তুলে ধরেছে। বাল্যবিবাহ রোধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অ্যামনেস্টি বলেছে, জরিপে দেখা গেছে ৪০ শতাংশের বেশি নারী ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে করেন। পাশাপাশি বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং উত্তরাধিকার অধিকার সুরক্ষাসহ নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন ব্যাপকভাবে অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। তারা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৯০ অনুসমর্থনের আহ্বান জানায় এবং অস্থায়ী ও বাড়িভিত্তিক শ্রমিকদের শ্রম আইনের আওতায় আনার কথা বলে।
জলবায়ুর ইস্যুও ঠাঁই পেয়েছে অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে জলবায়ু নীতিতে মানবাধিকার আরও ভালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তারা দলিত স্যানিটেশন কর্মীদের জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শিবিরগুলোতে বসবাসরত ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর অধিকার সুরক্ষা বাংলাদেশকে অব্যাহত রাখতে হবে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে অ্যামনেস্টি। তারা রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি মৃত্যুদণ্ডের বিলুপ্তি চেয়েছে। কারও অনুপস্থিতিতে বা বিশেষ আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি তারা ন্যায্য বিচারের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে।