রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর না হওয়ায় ‘নতুন কৌশল’ নির্ধারণ করা প্রয়োজন এবং নতুন কৌশল নির্ধারণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিশন বা বিশেষ দপ্তর গঠন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: নির্বাচন পরবর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল স্টাডিজ (আইআইজিএস)।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে আইআইজিএসের উপদেষ্টা অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, শুধু চাপের কৌশল নয়, প্রণোদনা যুক্ত করেই সংকট মোকাবিলায় আগাতে হবে। এ জন্য মায়ানমারে ‘রাখাইন পুনর্গঠন পরিকল্পনাও’ মাথায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে এখন পর্যন্ত পাঁচটি পথ অনুসরণ করা হয়েছে—দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বহুপক্ষীয় উদ্যোগ, ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া এবং নিষেধাজ্ঞা। তবে এসব উদ্যোগে তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এর প্রধান কারণ, মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জটিলতা।’
নির্বাচন পরবর্তী সরকারের করণীয় হিসেবে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রথমত, একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, একটি সমন্বিত রোহিঙ্গা কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, যেখানে পুনর্গঠন পরিকল্পনাও যুক্ত থাকবে। সংকট সমাধানের জন্য জরুরিভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিশন বা বিশেষ দপ্তর গঠন এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার পরামর্শও দেন তিনি।
ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত রয়েছে, যা একটি বড় মানবিক সংকটের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের সমাধান শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক জবাবদিহি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। এ নিয়ে মায়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গেও কথা বলতে হবে।
সেমিনারে ‘ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস)’ চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহি আকবর বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান না হলে বাস্তব সক্ষমতার মাধ্যমেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পথে এগোতে হবে। সে জন্য রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকারের আলাদা একটি টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আমিনুল করিম বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু মানবিক সহায়তাই নয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।’
সেমিনারে আইআইজিএসের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের নিরাপত্তা মূলত প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন পরবর্তী সরকারের উচিত নিরাপত্তা নীতিতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সামরিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণেরও পরামর্শ দেন আরিফুর রহমান।’
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহসভাপতি মামুনুর রশিদ খান, জামায়াতে ইসলামীর শুরা সদস্য এ কে এম রফিকুন নবী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব হুমায়রা নূর, গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য আবু হানিফ, ইসলামী ঐক্যজোটের যুগ্ম মহাসচিব শামসুল আলম প্রমুখ।
আলমগীর হোসেন/নাঈম