ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় দেশগুলোতে, যেখানে প্রায় ৭০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। যুদ্ধের পরিধি ও তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রবাসী বাংলাদেশিরা চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এসব প্রবাসী বাংলাদেশির পরিবার ও স্বজনদেরও দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ও বাহরাইনে দুই বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে এবং আরও ৫ বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। এ অবস্থায় প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। গতকাল সোমবার মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন-পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে দুজন বাংলাদেশি নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। আমাদের রাষ্ট্রদূতরা সেখানে ছুটে গেছেন। কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের মন্ত্রীদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা আমাদের নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। দেশে এসে আটকে পড়া প্রবাসীদের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকেই দেশে আটকে পড়েছেন। তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও বেসামরিক বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। বিদেশগামী যারা আটকে পড়েছেন, তাদের যাওয়ার বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব। এ সময় নিহত বাংলাদেশিদের লাশ বিমান চলাচল স্বাভাবিক হলে দেশে আনা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রমবিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ও চলমান সংকট নিয়ে যৌথভাবে পররাষ্ট্র, বেসামরিক বিমান চলাচল ও প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে লোক সরিয়ে আনার বিষয়টি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ইস্যুতে নাগরিকদের সুবিধা-অসুবিধা ও তাদের নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এগুলোকে টপ প্রায়োরিটি দিয়ে কাজ চলছে। যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে ও টিকিট নিয়েছেন, তারা যেন বিপদে না পড়েন সে জন্য বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকরা যেন সুরক্ষিত থাকে সে বিষয়েও কথা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে বিভিন্ন দেশে বিমান চলাচল স্থগিত বা সীমিত হওয়ায় প্রবাসী কর্মী ও উমরাহ পালনে ইচ্ছুক যাত্রীরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে দেশে ফিরতে পারছেন না। অ্যাভিয়েশন খাতও বিপাকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। আর এ ঘোষণার সরাসরি প্রভাব পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ফ্লাইট বাতিলের পর হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। ফ্লাইট পরিচালনার ব্যাপারে তারা সঠিক কোনো তথ্য পাচ্ছেন না। অনেকের আবার ভিসার মেয়াদ শেষের পথে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গতকাল ২ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যগামী ৩৯টি ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে গত ৩ দিনে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের মোট ১০২টি ফ্লাইট বাতিল হলো। এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি ফ্লাইট ও ১ মার্চ ৪০টি ফ্লাইট বাতিল হয়। বর্তমানে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, আবুধাবি, শারজাহ, দুবাই ছাড়া অন্যান্য রুটে ফ্লাইট পুনরায় চলাচল শুরু হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান, কাতারসহ সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো। পরিস্থিতি বিবেচনায় নগদ টাকা, আইডি, হেলথ কার্ড, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মোবাইল চার্জার ও শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সবসময় নিজের সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীরা জানান, বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের ঘরের বাইরে অবস্থান করার ব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছে। এ ছাড়া সাইরেন শুনলে নিরাপদ জায়গায় অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে প্রবাসীদের পরিবার ও স্বজনরা টেলিভিশনের পর্দায় সব সময় চোখ রাখছেন। সুযোগ পেলেই নিজ নিজ পরিবারের সদস্যদের খবর নিচ্ছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ইরানের হামলার ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পরিবারগুলোতে। প্রতি মুহূর্ত আতঙ্কে কাটছে তাদের। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দুজন বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে। প্রবাসে থাকা প্রিয়জনের সুস্থতার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছেন পরিবারের সদস্যরা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস করা বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। প্রতিটি পরিবারই প্রবাসে থাকা প্রিয়জনকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন। এক ধরনের হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে পরিবারগুলোতে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে বসবাসরত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার আজিজুল হক শিব্বিরের জন্যও উৎকণ্ঠায় আছেন তার স্বজনরা। শিব্বিরের মা নিলুফা বেগম জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। প্রতিদিনই ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন, ভিডিও কলে ছেলেকে দেখছেন।
ফেনী প্রতিনিধি
সৌদি প্রবাসী আরাফাত হোসেন রিয়াদ মোল্লা জানান, খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে আমাদের ভয় ও আতঙ্ক বাড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাসায় থাকতে পরিবার থেকেও বলা হচ্ছে। সব মিলিয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় আছি।
সৌদি আরবের দাম্মামে অবস্থিত সৌদি আরামকোর গ্যাস প্ল্যান্টে কর্মরত ফুলগাজী উপজেলার আমজাদ হাট ইউনিয়নের প্রবাসী শরিফুল ইসলাম সাগর জানান, সকাল থেকে ইরানের ড্রোন হামলার খবর পাচ্ছি। আমরা আতঙ্কে আছি। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দেশ থেকে বাবা-মা বারবার ফোন দিয়ে খবর নিচ্ছেন।
একই ইউনিয়নের প্রবাসী হাসান মির্জা বলেন, গতকাল তার বাংলাদেশে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল, কিন্তু যেতে পারিনি। ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার কারণে সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। আমাকে নিয়ে পরিবার দুশ্চিন্তায় আছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় অবস্থানরত রিয়াদ হোসেন শুভ জানান, তারা ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের কয়েকজন একসঙ্গে থাকছেন। কোম্পানি থেকে নিরাপদে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাই তারা নিরাপদ অবস্থানে আছেন।
কুমিল্লা প্রতিনিধি
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশিদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। সংঘাত শুরুর পর থেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, সৌদি আরবের রিয়াদ, কাতারের দোহা, বাহরাইন কিংবা কুয়েতে থাকা বাংলাদেশিরা যেমন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তেমনি উৎকণ্ঠায় আছেন বাংলাদেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনের হুরা এলাকায় একটি কোম্পানিতে কাজ করা কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মোশারফ হোসেন বলেন, ‘হামলা শুরুর পর থেকেই আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। কখন কী হয়, বুঝতে পারছি না। প্রথম যখন হামলা হলো আমরা ভয়ে ছোটাছুটি শুরু করলাম। পরে টেলিভিশন এবং সামাজিক মাধ্যমে এসব তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে দেশ থেকে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্ক নিয়ে একের পর ফোন করতে থাকে। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি, তবে শেষ পর্যন্ত কী হয় জানি না।’




