যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। সবস্তরের মানুষের ফুলেল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে কবির সমাধিসৌধ।
সোমবার (২৫ মে) পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠের পাশাপাশি আয়োজন করা হয় স্মরণসভা, যেখানে জাতীয় কবির বর্ণাঢ্য জীবন, সাহিত্যকর্ম ও দর্শন নিয়ে আলোচনা করা হয়।
স্মরণসভা ও শ্রদ্ধা জানাতে আসা ব্যক্তিদের বক্তব্যে উঠে আসে- আগামী দিনগুলোতেও কবি নজরুল সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন। তার কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম যুগে যুগে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সব ধরনের আন্দোলন-সংগ্রামে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
সোমবার সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে শোভাযাত্রাসহ কবির সমাধিতে গমন, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করা হয়। পরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে কবির সমাধি প্রাঙ্গণে এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
স্মরণসভায় অংশ নিয়ে উপাচার্য বলেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও অভাব-অনটনের মধ্যেও তার লেখনী থেমে থাকেনি। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনে তার সফল বিচরণ ছিল।
জাতীয় কবিকে তিনি সাম্যের কবি, বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, শান্তির কবি ও সব্যসাচী কবি হিসেবে অভিহিত করে বলেন, গবেষণা ও চর্চার মাধ্যমে তার দর্শনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তার আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী জাতীয় কবির চেতনা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুগে যুগে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
এ ছাড়া স্মরণসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।
এছাড়া বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম ‘দ্রোহের কবি, প্রাণের কবি নজরুল’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন।
এদিকে নজরুলের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসে কবির নাতনি খিলখিল কাজী স্কুল-কলেজে নজরুলচর্চা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে বলেন, নজরুলের রচনাগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিতে হবে। এছাড়া স্কুল-কলেজে শুধু কয়েকটি কবিতা দিয়েই নজরুলকে চেনানো হয়। তাকে জানতে হলে তার পুরো জীবনী সম্পর্কে জানতে হবে। স্কুল-কলেজে যদি নজরুলের পূর্ণাঙ্গ জীবনী পড়ানো হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা তাকে আরও বিশদভাবে জানতে পারবে।
এ সময় তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীতে সরকারি ছুটি ঘোষণার দাবি জানান।
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাজী নজরুল ইসলাম প্রধান প্রেরণা ছিলেন উল্লেখ করে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিদ্রোহ, সাম্য ও মানবতার পতাকা বহন করেছেন কবি নজরুল। যত জাতীয় আন্দোলন হয়েছে, প্রতিটিতে মানুষ তার গান ও কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রধান প্রেরণা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময় ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে পালন করা হবে। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এ আয়োজন সফল করা হবে। জাতীয় ও সামাজিক জীবনে নজরুল সব সময় প্রাসঙ্গিক। তিনি উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে গোটা উপমহাদেশকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে এ পর্যন্ত যত সংগ্রাম ও আন্দোলন হয়েছে, নজরুলকে বাদ দিয়ে বা নজরুলের গান ছাড়া কোনো আন্দোলন সফল হয়নি। এমনকি এবারের জুলাই আন্দোলনেও পথে পথে তরুণরা নজরুলের গান গেয়েছে।
এদিকে নজরুল গবেষণা কেন্দ্র, নজরুল একাডেমি, কবি কাজী নজরুল ইনস্টিটিউট, নজরুল চর্চা কেন্দ্র ‘বাঁশরী’, উদীচী, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাসদ, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস), ডাকসু, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ সমাধিতে জাতীয় কবিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি বিদ্রোহী কবির আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়।
প্রসঙ্গত, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। নজরুলের ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। বাংলা সাহিত্য জগতে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে।
২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।
আরিফ জাওয়াদ/অমিয়/




