ফাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের একটি দল (জামায়াতে ইসলামী) নিষ্ঠুরতা থেকে নিজেদের বাঁচাতে ফ্যাসিবাদীদের ‘ছাতার নিচে’ আশ্রয় নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পতিত পরাজিত পলাতক স্বৈরাচার একইভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা দলটির ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে কি-না এ ব্যাপারে ভাববার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।’
বুধবার (১২ নভেম্বর) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। সভার আয়োজন করে বিএনপি।
গণভোটের আড়ালে পলাতক অপশক্তিকে রাষ্ট্র রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে কি-না এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘স্বল্প মেয়াদের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সব ক্ষেত্রে সার্বিক সফলতা আশা করে না জনগণ। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্বও নয়। এখন সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি একটি রাজনৈতিক দলের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করবে, নাকি গণতন্ত্রকামী জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকেই অগ্রাধিকার দেবে।’
কিছু দল নানা শর্ত দিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধার সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টির অর্থ একদিকে নির্বাচন না করেই রাষ্ট্রযন্ত্রে খবরদারির সুযোগ গ্রহণ করা, অপরদিকে পলাতক স্বৈরাচারের পুনর্বাসনের পথ সুগম করা। আমি মনে করি, পলাতক স্বৈরাচারীর সহযোগীরা গত কয়েকদিন রাজধানীতে যেভাবে আগুন-সন্ত্রাস চালিয়েছে, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির করণীয় সম্পর্কে এটি একটি সতর্কবার্তা হতে পারে।’
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ পতনের আন্দোলনে ছাত্র-জনতা-নারী-পুরুষ-কৃষক-শ্রমিক সব শ্রেণি-পেশার মানুষ কিন্তু রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই রাজপথে নেমে এসেছিলেন। আমি মনে করি, অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা রাজনৈতিক দরকষাকষি করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার জন্যই হাজারো লাখো মানুষ রাজপথে জীবন বিলিয়ে দেয়নি।’
সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে কয়েকটি দল
তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের ভোটে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যখন সরকার প্রস্তুত হচ্ছে, তখন কয়েকটি রাজনৈতিক দল অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কার্যত গণতন্ত্রকামী জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দুর্বল অন্তর্বর্তী সরকারকে হুমকি-ধামকি না দিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারিতে জনগণের মুখোমুখি হন। আমাদের মনে রাখা দরকার, দলীয় সমর্থক ও নেতা-কর্মীদের বাইরেও কিন্তু লাখো কোটির অরাজনৈতিক এক বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই নির্দলীয় জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা বাস্তবায়নের দিকে নজর দেওয়া আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে মাসের পর মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে একটি উল্লেখযোগ্য সময় পার করে দিয়েছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এসব আলোচনায় নির্দলীয় বিশাল এই জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় কৃষি-শিক্ষা-স্বাস্থ্য, নারীর নিরাপত্তা, তরুণদের কর্মসংস্থান, স্বল্প আয়ের মানুষদের জীবন যুদ্ধের কি গুরুত্ব পেয়েছিল? দেশে কিন্তু শুধু কোটা সংস্কার নয়, নিরাপদ সড়কের জন্যও তুমুল আন্দোলন হয়েছিল। গত এক বছরে দেশে সড়কপথে কমপক্ষে ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। আলোচনায় সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি কি জায়গা পেয়েছে?’
আগামী দিনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের কৃষি ও গার্মেন্টস সেক্টর, তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘দেশে গার্মেন্টস শিল্প থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি। কিন্তু নারীদের আট ঘণ্টার পরিবর্তে ৫ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তাদের বাকি কর্মঘণ্টার টাকা কে দেবে? কর্মঘণ্টা কমানোর কথা বলে কৌশলে নারীদের চাকরি না দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে কি-না? এই মুহূর্তে গণভোটের চেয়ে তাদের আতঙ্ক দূর করা জরুরি।’
রাজপথের আন্দোলনরত দলগুলোর উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘সংবিধানে লেখা থাকলেই সব কিছু নিশ্চিত হয়ে যায় না। আসলে সবার আগে প্রয়োজন রাষ্ট্র রাজনীতি সম্পর্কে মোনাফেকি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। প্রয়োজন রাজনৈতিক সমঝোতার। প্রয়োজন গণতান্ত্রিক মানসিকতা। সর্বোপরি প্রয়োজন দেশপ্রেম এবং জাতীয় ঐক্য।’
জাতীয় ঐক্য অটুট রাখতে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে বিএনপি
দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য অটুট রাখতে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিটি দফার অধিকাংশ পয়েন্টেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে বিএনপি। আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার- জুলাই সনদে যা অঙ্গীকার করা হয়েছে বিএনপি এইসব অঙ্গীকার রক্ষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তবে কোনো রাজনৈতিক দল যদি অন্তর্বর্তী সরকারকে দুর্বল পেয়ে যা ইচ্ছে তাই আদায় করে নিতে চায় কিংবা বিএনপির বিজয় ঠেকাতে অপকৌশলের আশ্রয় নেয়, তাহলে সেটি শেষ পর্যন্ত তাদের জন্যই বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি-না সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকা দরকার। অযথা পরিস্থিতি ঘোলাটে না করতে দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই।’
একটি গোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দেয়নি জনগণ
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন বলে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে একদলীয় শাসন কায়েম এবং সেনাবাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছে। দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের পথ ধরে পরাজিত অপশক্তিরা পুনরায় মহাজোটের নামে একজোট হয়ে দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। দীর্ঘ দেড় দশক পর হাজারো শহিদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থানে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।’
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএনপি মনে করে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। ২০২৪ ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। প্রতিটি বিপ্লব কিংবা অভ্যুত্থানের একটাই আকাঙ্ক্ষা ছিল- স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ভবিষ্যতে আর কেউ যাতে দেশ ও জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে, বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে এটিই হোক আমাদের এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য।’
দেশের চলমান সংকট উদ্দেশ্যমূলক: মির্জা ফখরুল
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশে একটা সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা অপ্রয়োজনীয় সংকট। এই সংকট অত্যন্ত উদ্দেশ্যমূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে বাধাগ্রস্ত করা, দেশে সত্যিকার অর্থে সংস্কারের জন্য যে নির্বাচন হওয়া দরকার সে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা, জনগণের ভবিষ্যতকে একটা অনিশ্চিত অবস্থায় ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে সেই সমস্ত চক্রান্তকে রুখে দিয়ে সত্যিকার অর্থেই একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উত্তরণের পথকে সুগম করি।’
বিএনপি প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও সাত্তার পাটোয়ারীর যৌথ সঞ্চালনায় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, বেগম সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জাতীয় পার্টি (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, এবি পার্টি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদ সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ।
শফিকুল/এসজি/