৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর থেকেই ঝালকাঠি-২ (সদর-নলছিটি) আসনে বিএনপির ডজনখানেক মনোনয়নপ্রত্যাশীর তৎপরতা দেখা যায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নিজ নিজ দলের পক্ষে তাদের সর্বত্র গণসংযোগ ও প্রচার করতে দেখা যায়। বিএনপি থেকে সাবেক এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে মন জয় করার চেষ্টা করছেন। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে পাল্টে যেতে পারে এ আসনের ভোটের হিসাব।
তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই ঝালকাঠিতে নির্বাচনি উত্তাপ ছড়ায়। তবে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পরিবর্তন হতে পারে এমন গুঞ্জনে ইলেনবিরোধী শিবিরে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। ইসলামি দলের প্রার্থীরাও সম্ভাবনার আলো দেখছেন। এখানকার নির্বাচনি প্রচারের মাঠে নদীভাঙন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে নদী-খালবেষ্টিত এ আসনে। আসনটিতে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী থাকলেও অভ্যন্তরীণ বিভাজন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে ইসলামি দলগুলোর সক্রিয়তা ভোটের হিসাব পাল্টে দেবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন। ২০০১ সালে বিএনপির ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো জয়ী হলেও ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা চারবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমির হোসেন আমু এ আসন থেকে নির্বাচিত হন। আসনটিতে এবারও বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। তবে মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতরে ব্যাপক বিরোধ রয়েছে। এ কারণে বিএনপির একাংশ ইলেন ভুট্টোর মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছিল। তারা চাইছিল কেন্দ্রীয় মহিলা দল নেত্রী ও ঝালকাঠি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জিবা আমিনা খান, বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাহবুবুল হক নান্নু, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাহাদাৎ হোসেনকে প্রার্থী করা হোক। তাই এখন পর্যন্ত এই তিন নেতার সমর্থকরা ইলেন ভুট্টোর নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেননি। যদিও দলের নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন, তারা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন।
এ আসনে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ থেকে শেখ নেয়ামুল করিম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে ডা. সিরাজুল ইসলাম সিরাজী, আমার বাংলাদেশ পার্টি থেকে শেখ জামাল হোসেন, গণঅধিকার পরিষদ থেকে মাহমুদুল হাসান সাগর, খেলাফত মজলিস থেকে ডা. সিদ্দিকুর রহমান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি থেকে ফোরকান হোসেন এবং মো. মারুফ বিল্লাহকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো বলেন, ‘আমি কখনো সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। জনগণের আস্থাই আমার শক্তি।’ জামায়াতের প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নদীভাঙন রোধ এবং সড়ক উন্নয়নই প্রধান অগ্রাধিকার।
সিয়াম হাসান নামে এক নবীন ভোটার বলেন, ‘প্রথমবার ভোট দেব। চাই এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি সংসদে এলাকার কথা বলবেন।’
এদিকে নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজের (সনাক) প্রতিনিধিরা। সনাকের ঝালকাঠির সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা সত্যবান সেনগুপ্ত বলেন, ‘নির্বাচনে প্রতিযোগিতা থাকবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিহিংসা ও সহিংসতার কোনো জায়গা নেই। আশা করি, সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা জনগণকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেবেন।’
ঝালকাঠি শহরের সাধারণ ভোটাররা বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। ভোটাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। তবে এবারের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন তরুণ ভোটাররা। দেশ যেন আবার নতুন ফ্যাসিবাদের কবলে না পড়ে সে বিষয়ে সবাই বেশ সচেতন। গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদতন্ত্র সবই দেখা হয়েছে। এবার সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন হলে কেমন চলবে সেটি দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান তারা।
ঝালকাঠির তরুণ ভোটাররা বলেন, ‘তরুণরা এবার যেদিকে ঝুঁকবেন নির্বাচনে শেষ হাসি তারাই হাসবেন।’ এই প্রথম স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন এটিই পরম তৃপ্তির হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তারা। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সাবেক ঝালকাঠি জেলা সভাপতি ইলিয়াস সিকদার ফরহাদ বলেন, প্রার্থী বাছাইয়ে দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে তারা নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন। আবার যদি চাঁদাবাজ, দখলদার, দুর্নীতিগ্রস্ত ও টেন্ডারবাজরা ক্ষমতায় আসে, তাহলে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নাও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।