বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীও। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাঁচটি করে আসনে বিজয়ী হয়ে গড়েন অনন্য রেকর্ড। অর্থাৎ কোনো নির্বাচনেই হারেননি তিনি। রাজনীতি ও দেশ পরিচালনায় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে পৌঁছে যান জনপ্রিয়তার শিখরে। বিএনপির ৪৬ বছরের ইতিহাসে প্রায় ৪০ বছর ধরে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। নীতি ও আদর্শে অটুট থাকায় তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। যদিও জীবনের শেষ বছরগুলোতে হাসপাতালে চিকিৎসা আর গুলশানের বাসভবনে একরকম আবদ্ধ জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী এই রাজনীতিকের জীবন ঘটনাবহুল। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে বিভক্তির পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন। তাঁর আদি বাড়ি মূলত ফেনীতে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। তার শৈশব ও কৈশোর পার করেছেন দিনাজপুরের মুদিপাড়া গ্রামে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে লেখাপড়া করেন। ১৯৬০ সালে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে তার বিয়ে হয়। এরপর ১৯৬৫ সালে স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ছিলেন করাচিতে। এরপর ঢাকায় আসেন। কিছুদিন জয়দেবপুর থাকার পর জিয়াউর রহমানের পোস্টিং হলে চট্টগ্রামে চলে যান। জিয়াউর রহমান-খালেদা জিয়া দম্পতির দুই সন্তান তারেক রহমান আর প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকসেনারা তাকে ও তার দুই ছেলেকে বন্দি করে। ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি ছিলেন তিনি।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পথের অনুসারীদের এক মঞ্চে এনে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমান।
স্বামী নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরোদস্তুর গৃহবধূই ছিলেন খালেদা জিয়া। দুই ছেলেকে লালন-পালন ও ঘর-সংসার নিয়েই সময় কাটত তার। দেশের সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হিসেবে তেমন কোনো পদচারণা ছিলো না। তবে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। রাজনীতির প্রতি খালেদা জিয়ার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। এসময় দলের নেতা-কর্মীরা রাজনীতিতে আসার জন্য দিনের পর দিন খালেদা জিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি দলের হাল না ধরলে দল টিকবে না বলেও অনেকে বলেন। ফলে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দলের নেতাকর্মীদের আহ্বানে বিএনপির হাল ধরেন তিনি।
১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগ দেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় সবার প্রশংসা ও আস্থা অর্জন করেন। পরের বছরের মার্চে তিনি দলটির ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন এবং একই বছরের আগস্টে চেয়ারপার্সন পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
যদিও বিএনপির দায়িত্ব নেয়ার পরই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। তখন পর্যস্ত সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। দল ঐক্যবদ্ধ রেখে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন আন্দোলন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কয়েকবার আটক করা হলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি বিএনপি চেয়ারপার্সন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশজুড়ে খালেদা জিয়ার ব্যাপক পরিচিতি গড়ে উঠে। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করে। বেগম জিয়ার নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি। ফলে রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এরপর ২০০১ সালে আবারও ক্ষমতায় আসে দলটি।
ওয়ান ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়াকে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আরেকবার গ্রেপ্তার করা হয়। এক বছরের বেশি কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি হাইকোর্টের আদেশে মুক্তি পান। তিনি আইনি লড়াই করে সব মামলায় জামিনে মুক্তি পান। কারাগারে থাকাকালে তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তিনি ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হন। ওই বাড়িটিতে ২৮ বছর ছিলেন বেগম জিয়া। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার সেনানিবাসের বাড়িটি তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর দলের চতুর্থ কাউন্সিলে দ্বিতীয়বার, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তৃতীয়বার এবং ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলের দশম কাউন্সিলে চতুর্থবারের মতো বিএনপির চেয়ারপার্সন হন। এছাড়া ২০১১ সালের ১৬ মার্চ বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ ৫ বছর পর ভারমুক্ত হন তিনি। রাজনীতিতে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল গণমাধ্যমে বলেন, বিএনপির ওপর একের পর আঘাত আসলেও মূলত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) দুবার চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকার জন্য, তাকে ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট "গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা" উপাধিতে সম্মানিত করে।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ছোট ছেলে কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মারা যান। তখন থেকেই বেশ ভেঙে পড়েন খালেদা জিয়া। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ায় ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারেননি। এরপর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৮ সাল থেকে খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন।
বাস্তবতার কারণে দলটির নেতৃত্ব হয়ে পড়ে দ্বি-কেন্দ্রিক। তবে দলের নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব চলে আসে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে। তিনি ১৯৯৭ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্যপদ নিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। এরপর দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হয়ে এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বেগম খালেদা জিয়া ২০২০ সাল থেকে সরকারের নির্বাহী আদেশে কারাগারের বাইরে নিজ বাসায় থাকতে পারলেও এসময় নানা বিধিনিষেধ পালন করতে হয় তাকে। যার মধ্যে রাজনীতিতে অংশ নিতে না পারা, বিদেশ যেতে না পারা ইত্যাদি। শেষ দিনগুলোতে শারীরিক নানা জটিলতায় হাসপাতাল থেকে বাসা আবার বাসা থেকে হাসপাতালেই কেটেছে তার সময়।
শফিকুল ইসলাম/