পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনাকে ‘আহসানুল কাসাস’ তথা ‘শ্রেষ্ঠ কাহিনি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই ঘটনায় যে পরিমাণ উপদেশ, নসিহত ও হেকমত রয়েছে, অন্য কোনো সুরায় একই স্থানে এ পরিমাণ নেই।
ইয়াকুব (আ.)-এর ১২ সন্তান ছিল। তাদের মধ্যে ইউসুফ ছিলেন অসম্ভব সুন্দর। তাঁর বাবা তাঁকে বেশ ভালোবাসতেন। ভালোবাসার অন্যতম কারণ হলো, ইউসুফ শৈশবে একটি বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখেন, যা ছিল তার নবী হওয়ার শুভ বার্তা। এ ছাড়া ইউসুফ ছিলেন মা হারানো এতিম বালক ও ভাইদের মধ্যে ছোট। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘ইউসুফ তার বাবাকে বলল, ‘হে আব্বাজান! আমি (স্বপ্নে) দেখেছি ১১টি তারকা আর সূর্য ও চন্দ্র; তারা আমাকে সেজদা করছে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪)
ইউসুফের প্রতি বাবার প্রচণ্ড ভালোবাসায় অন্য ভাইয়েরা হিংসায় জ্বলত। এক দিন তারা ইউসুফ (আ.)-কে জঙ্গলের এক কূপে ফেলে দেয়। বাড়ি ফিরে তারা বাবাকে ইউসুফের মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ দেয়। পুত্রের শোকে কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন ইয়াকুব (আ.)। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৮)
সেই কূপের পথ ধরে ফিরছিলেন একটি কাফেলা। পানির প্রয়োজনে কূপ থেকে বালতি উঠাতেই ফুটফুটে সুন্দর ইউসুফকে দেখতে পান। তারা তাঁকে মিসরে বিক্রি করে দেয়। মিসরের প্রধানমন্ত্রী কিতফির তাকে কিনে নিয়ে যান। সেখানেই তিনি বড় হতে থাকেন। এক দিন যৌবনে পা রাখেন ইউসুফ। রূপ ও সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল তাঁর যৌবন। তিনি ছিলেন মাধুর্য ও কমনীয়তার মূর্ত প্রতীক। চেহারা ছিল চন্দ্র ও সূর্যের মতো দীপ্তিমান। নিষ্কলুষতা ও লজ্জার আধিক্য সোনায় সোহাগার মতো কাজ করছিল। এসব গুণাবলি ছিল তার সব সময়ের সঙ্গী। (কসাসুল কুরআন, হিফজুর রহমান, অনুবাদ: মাওলানা আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ১৭)
সেসময় আজিজে মিসরের স্ত্রী জুলেখা নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। ইউসুফের রূপে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি ইউসুফকে খারাপ কাজের প্রতি আহ্বান করেন, ইউসুফ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ইউসুফকে বসে আনতে নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকে সে। জাদুও করল, কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এক দিন ইউসুফকে একা ঘরে পেয়ে দরজা বন্ধ করে দিল সে। পাপের দিকে আহ্বান করল। আল্লাহর ভয়ে তিনি জুলেখার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলেন। উপায়ন্তর না দেখে বন্ধ দরজার দিকে দৌড় দিলেন ইউসুফ। দরজা খুলে গেল।
ঘটনাচক্রে দরজার ওপাশে আজিজে মিসর কিতফির ও জুলেখার চাচাতো ভাই দাঁড়ানো ছিল। জুলেখা ইউসুফের ওপর অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করল। সত্যতা যাচাইয়ে ছিঁড়া জামার প্রমাণ পেশ করা হলো। জামার পেছন দিক ছিঁড়া থাকায় জুলেখা অপরাধী সাব্যস্ত হলো। তবুও জুলেখার সম্মান রক্ষায় মিথ্যা মামলায় ইউসুফকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ২৩-২৯)
অনেকের ধারণা, ইউসুফ (আ.) জুলেখার সঙ্গে প্রেম করেছেন— এটি সত্য নয়। এটি একটি প্রচলিত ভুল। জুলেখার একপক্ষীয় প্রেম ছিল। জুলেখা ইউসুফ (আ.)-এর ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল। ইউসুফ (আ.) তা অস্বীকার করেন এবং একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু ইউসুফ (আ.)-এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিল। সত্য বুঝতে পারার পরও জুলেখার সম্মান বাঁচাতে তার স্বামী কিতফির ইউসুফ (আ.)-কে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। (কসাসুল কুরআন, হিফজুর রহমান, অনুবাদ : মাওলানা আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩০)
জুলেখার সঙ্গে ইউসুফ (আ.)-এর বিয়ে হয়েছিল কিনা— এ বিষয়ে কোরআন-হাদিস থেকে স্পষ্ট কিছুই জানা যায়নি। তবে ইতিহাসবিদ ও মুফাসসিররা বিচ্ছিন্ন সনদে উল্লেখ করেছেন, স্বামী কিতফিরের মৃত্যুর পর এবং তওবা করার পর ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে জুলেখার বিয়ে হয়েছিল। (তাফসিরে ইবনে আবি হাতিম, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ৩৯০; তাফসিরে তবারি, খণ্ড: ১৬, পৃষ্ঠা: ১৫১)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক