পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘সে (মরিয়ম) বলে উঠল, হায়! এর আগেই যদি আমি মরে যেতাম আর (মানুষের) স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে যেতাম!’ (সুরা মরিয়ম, আয়াত: ২৩)
মরিয়ম (আ.) ছিলেন ইসা (আ.)-এর মা। বনি ইসরায়েলের প্রসিদ্ধ আবেদ এবং সংসারত্যাগী ইমরানের কন্যা। মা হান্নাহ বিনতে ফাখরুজও অত্যন্ত পরহেজগার ও ইবাদতকারী ছিলেন। তারা ছিলেন নিঃসন্তান। হান্নাহ প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষী ছিলেন সন্তানের জন্য। দিনমান আল্লাহর কাছে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে প্রার্থনা করতেন। মানত করলেন, সন্তান হলে মসজিদুল আকসার সেবায় উৎসর্গ করবেন। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড: ২)
হান্নাহ একদিন কন্যাসন্তান প্রসব করলেন। ততদিনে ইমরান মারা গেছেন। সন্তানের নাম রাখলেন মরিয়ম। সুরিয়ানি ভাষায় এর অর্থ খাদেম বা সেবক। মানতের সঙ্গে নামটা বেশ জুতসই এং সামঞ্জস্যপূর্ণ হলো। কিন্তু হান্নাহকে দুশ্চিন্তা গ্রাস করেছিল; ‘মেয়ে কীভাবে মসজিদুল আকসার খাদেম হবে’! তবে আল্লাহ তার এই সন্তানকে মসজিদের জন্য কবুল করলেন। (ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৫)
সেসময় বায়তুল মুকাদ্দাসের খাদেম ছিলেন জাকারিয়া (আ.)। তাঁর তত্ত্বাবধানে মরিয়ম (আ.) সেখানে যুক্ত হলেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মরিয়ম, আল্লাহ তোমাকে বাছাই করে নিয়েছেন। পবিত্র-পরিচ্ছন্ন রেখেছেন এবং বিশ্ব নারীসমাজের মধ্য থেকে তোমাকে মনোনীত করেছেন।’ (সুরা মরিয়ম, আয়াত: ৪২)
মসজিদের পাশের ছোট এক কামরায় থাকতেন মরিয়ম (আ.)। ইবাদতে কাটাতেন দিনরাত। তাঁর জন্য জান্নাতের খাবার আসত। এসব দেখে জাকারিয়া (আ.) বিস্মিত হতেন।
একসময় যৌবনে পা রাখলেন মরিয়ম (আ.)। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে পৃথিবীতে ক্ষমতা প্রকাশের ইচ্ছা করলেন। জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর কাছে পাঠালেন। মরিয়ম (আ.) ভয় পেয়ে বসলেন। আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। যুবককে স্মরণ করিয়ে দিলেন আল্লাহর কথা। যুবক বললেন, আমাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। আপনাকে পবিত্র পুত্র দানের উদ্দেশ্যে।
সুরা মরিয়মের ১৬ থেকে ৪০ নম্বর আয়াতে মরিয়ম (আ.) ও ইসা (আ.)-এর জন্মের ঘটনা আলোচিত হয়েছে।
আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে মরিয়ম (আ.) গর্ভবতী হলেন। প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি মসজিদ ছাড়লেন। চলে গেলেন নির্জন ভূমিতে। যেখানে ঘরবাড়ি নেই। মানুষ নেই। খাদ্য নেই।
স্বামীর সংস্পর্শ ছাড়া সন্তান হবে; এটা তিনি সইতে পারছিলেন না। মেনে নিতে পারছিলেন না। ফলে মরে যেতে চাইলেন। মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে চাইলেন। আল্লাহ তাঁর অভিব্যক্তি এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘সে বলে উঠল, হায়! এর আগেই যদি আমি মরে যেতাম আর (মানুষের) স্মৃতি থেকে পুরোপুরি মুছে যেতাম!’ (সুরা মরিয়ম, আয়াত: ২৩)
যেখানে জিবরাইল (আ.) তাঁকে বলেছেন, ‘এই সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে, তিনি এই সন্তানের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য নিদর্শন ও রহমত বানাবেন। এটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।’
ইসলামে মৃত্যু কামনা নিষেধ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বিপদে পড়ে অধৈর্য হয়ে মৃত্যু কামনা না করে।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৯)
অথচ আয়াতে মরিয়ম (আ.) মৃত্যু কামনা করেছেন। এই আপত্তির জবাবে মুফাসসিরগণ বলেন, তিনি মানুষের অপবাদ ও দুর্নামের ভয়াবহতায় পড়ে এমনটি বলেছেন। মৃত্যু কামনা করা তাঁর মূল উদ্দেশ্য নয়, গুনাহ বা অপবাদ থেকে বাঁচাই উদ্দেশ্য। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা মরিয়মের ২৩ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)
আল্লাহতায়ালা মরিয়ম (আ.)-কে সম্মানিত করেছেন। তাকে জান্নাতে সর্বোত্তম নারীর মর্যাদা দিয়েছেন। আব্বাস (রা.) বলেন, ‘‘রাসুল (সা.) জমিনে চারটি রেখা টানেন। অতঃপর বলেন, তোমরা কি জানো, এগুলো কী?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভালো জানেন।’ তিনি বলেন, ‘জান্নাতবাসীর মধ্যে সর্বোত্তম নারী হলো খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.), ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ (রা.), মারিয়াম বিনতে ইমরান ও আসিয়া বিনতে মাজাহিম।’’ (মুসতাদরাক হাকিম, হাদিস: ২৯০৩)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক