ইসলামে মানুষের জন্য উপকারী সবকিছু হালাল। মানুষের জন্য ক্ষতি ডেকে আনে, এমন সবকিছুই হারাম। খাদ্যের মধ্যে হারাম হিসেবে উল্লেখিত প্রথম প্রকারটি হলো—মৃত জন্তু, হোক তা চতুষ্পদ প্রাণী কিংবা পাখি। মৃত জন্তু বলতে বোঝানো হয়েছে, যা শিকার বা জবাই তথা মানুষের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাভাবিকভাবে মারা যায়।
বর্তমান সময়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, মৃত জন্তু হারাম করে সেটাকে না খেয়ে ফেলে দেওয়ার কারণ কী? উত্তরে বলা যায়, মৃত জন্তু নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে নানা কারণ আছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো—
১. একজন সুস্থ রুচির মানুষের কাছে মৃত প্রাণী ঘৃণ্য ও অপছন্দনীয়। এজন্য সব আসমানি ধর্মেই মৃত প্রাণী নিষিদ্ধ। জবাই করা প্রাণী ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী খাওয়ার অনুমতি সেখানে মেলে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু আর শ্বাসরোধে মৃত জন্তু, শৃঙ্গাঘাতে মৃত জন্তু এবং হিংস্র পশুতে খাওয়া জন্তু; তবে তোমরা জবাই করতে পেরেছ, তা ছাড়া। আর যা মূর্তি পূজার বেদির ওপর বলি দেওয়া হয়েছে এবং জুয়ার তীর দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করা—এই সব পাপ কাজ...।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৩)
২. ইসলাম চায় একজন মুসলিমের সব কাজ হবে তার নিয়ত ও সংকল্প অনুসারে। কিছু পেতে হলে বা লাভ করতে হলে বিশুদ্ধ নিয়ত ও ইচ্ছা লাগবে। জবাইয়ের অর্থ হলো, খাওয়ার নিয়তে একটি প্রাণীর প্রাণনাশ। একজন মুমিন কোনো ইচ্ছা ও সংকল্প ছাড়াই কিছু খেয়ে ফেলবে, সেটা আল্লাহতায়ালার পছন্দ নয়। যেহেতু জবাই ও শিকার করা প্রাণীর মধ্যে মানুষের খাওয়ার ইচ্ছা ও সংকল্প পাওয়া যায়, তাই সেটি হালাল। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যেসব জন্তুর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়নি, সেগুলো খেও না। তা খাওয়া গুনাহ।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত: ১২১)
৩. প্রাকৃতিকভাবে মরে যাওয়া পশুর মৃত্যুর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। অধিক সম্ভাব্য কারণগুলো হলো, অতিরিক্ত বয়স, আকস্মিক রোগব্যাধি, বিষাক্ত উদ্ভিদ ভক্ষণ বা এ জাতীয় কোনো বিষয়। এসব মরা জন্তুগুলো মানুষের জন্য হতে পারে ভয়াবহ বিপজ্জনক। (হালাল-হারামের বিধান, মূল: ড. ইউসুফ আল-কারযাবি, অনুবাদ: আসাদুল্লাহ ফুয়াদ, পৃষ্ঠা: ৯২)
৪. মৃত জন্তু মানুষের জন্য হারাম হওয়ার ফলে বন্য জন্তুরা সেগুলো খেতে পারছে; অন্যথায় তারা কী খেত। তারাও তো আমাদের মতো আল্লাহর একটি সৃষ্টি। উন্মুক্ত প্রান্তরের মৃত প্রাণীদের ক্ষেত্রে এটা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আল্লাহ বলেন, ‘আর জমিনে বিচরণকারী সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি সেসবের স্থায়ী-অস্থায়ী অবস্থানক্ষেত্র সম্পর্কে অবহিত; সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে আছে।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)
৫. মানুষ যেন তার মালিকানাধীন জন্তুর ব্যাপারে যত্নশীল থাকে, সতর্ক থাকে এগুলোর রোগ-শোক বিষয়ে। শুধু তা-ই নয়, সে যেন দ্রুত একে চিকিৎসাসেবা দেয় বা জবাই করে তার আত্মাকে কষ্ট দেওয়া থেকে মুক্ত করে দেয়। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর চতুষ্পদ জন্তুগুলো তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তাতে রয়েছে উষ্ণতার উপকরণ ও বিবিধ উপকার। তা থেকে তোমরা আহার গ্রহণ করো। তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে সৌন্দর্য, যখন সন্ধ্যায় তা ফিরিয়ে আনো এবং সকালে চারণে নিয়ে যাও। এগুলো তোমাদের বোঝা বহন করে এমন দেশে নিয়ে যায়, ভীষণ কষ্ট ছাড়া যেখানে তোমরা পৌঁছাতে সক্ষম হতে না। তোমাদের পালনকর্তা অনুগ্রহশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫-৭)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক