আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের মোট দেড় পারা তেলাওয়াত করা হবে; সুরা নিসা ৮৮ থেকে সুরা মায়েদা ৮২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। পারা হিসেবে পঞ্চম পারার দ্বিতীয়ার্ধ এবং পুরো ষষ্ঠ পারা। এই অংশে মুনাফিকদের কূটচাল, মানুষ হত্যা, জিহাদ, ইসা (আ.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র, কুফর ও শিরকসহ নানা বিষয় বিবৃত হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শাস্তি
সুরা নিসার ৯২ ও ৯৩ নম্বর আয়াতে হত্যাকাণ্ডের শাস্তি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। হত্যা তিন প্রকার—১. ইচ্ছাকৃত হত্যা। ২. ইচ্ছাকৃত হত্যার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ইচ্ছাকৃতই হত্যা করা। কিন্তু এমন অস্ত্র দিয়ে, যা দিয়ে সাধারণত হত্যা করা হয় না। ৩. ভুলবশত হত্যা। কেউ কাউকে ভুলবশত হত্যা করলে একটি গোলাম আজাদ করবে এবং রক্ত বিনিময় প্রদান করবে। যাকে শরয়ি পরিভাষায় দিয়ত বলে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকারের শাস্তি হলো, হত্যাকারী ১০০ উট নিহতের উত্তরাধিকারীদের প্রদান করবে। মুসলমানকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকারী চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে।
জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব
ঈমান আনার পর মানুষের ওপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নামাজ। প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। নামাজ মুমিনের সৌভাগ্যের সোপান, শ্রেষ্ঠত্বের কারণ। ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা আবশ্যক। বড় কোনো সমস্যা ছাড়া জামাত ছাড়া নিষেধ। আল্লাহ বলেন, ‘এবং (হে নবি) আপনি যখন তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকেন ও তাদের নামাজ পড়ান, তখন (শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলার সময় তার নিয়ম এই যে) মুসলিমদের একটি দল আপনার সঙ্গে দাঁড়াবে এবং নিজেদের অস্ত্র সঙ্গে রাখবে। অতঃপর তারা যখন সিজদা করে নেবে, তখন তারা তোমাদের পেছনে চলে যাবে এবং অন্য দল, যারা এখনো নামাজ পড়েনি, সামনে এসে যাবে এবং তারা আপনার সঙ্গে নামাজ পড়বে। তারাও নিজেদের আত্মরক্ষার উপকরণ ও অস্ত্র সঙ্গে রাখবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১০২)
দাম্পত্য সম্পর্কে সমঝোতা ও বিচ্ছেদ
১২৭ থেকে ১৩০ নম্বর আয়াতে মানুষের দাম্পত্য জীবনের নানা জটিল বিষয়ের সমাধান দেওয়া হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হলো প্রীতি ও ভালোবাসার। অনেক স্বপ্ন বুনে তারা সংসার করে। একসঙ্গে থাকে। তবু কখনো কখনো নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। ঝগড়া-বিবাদ হয়। তখন সংসার টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে।
দাম্পত্য জীবন বিষিয়ে উঠলে স্বামী যদি স্ত্রীর সঙ্গে মন্দ আচরণ করে, স্ত্রীকে যদি অধিকারবঞ্চিত করে, তবে প্রথমে স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সমঝোতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করতে চেষ্টা করবে। প্রয়োজন হলে উভয় পক্ষ পারিবারিকভাবেও তা মীমাংসা করে নিতে পারবে। পবিত্র কোরআনে বলে দেওয়া হয়েছে, ‘যদি কোনো নারী তার স্বামী থেকে রূঢ়তা কিংবা উপেক্ষার আশঙ্কা করে, তবে তারা পরস্পর আপস করে নিলে তাদের কোনো গুনাহ নেই, বস্তুত আপস করাই উত্তম।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১২৮)
তবে আপস করার সুযোগ না থাকলে অবশ্যই বিচ্ছেদ করার অধিকার স্ত্রীর রয়েছে। ইসলাম কখনো নারীকে স্বামীর জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে যাওয়ার পরামর্শ দেয় না। বরং এক্ষেত্রে ইসলাম তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটানোর অনুমোদন দেয়। বরং ইসলাম মনে করে, স্বামীর অত্যাচার সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।
দস্তরখানের নামে যে সুরার নাম
মদিনায় অবতীর্ণ সুরা মায়েদার আয়াত সংখ্যা ১২০। পবিত্র কোরআনের পঞ্চম সুরা এটি। মায়েদা অর্থ দস্তরখান। সুরাটিতে দস্তরখান সম্পর্কিত একটি ঘটনা থাকায় এর নামকরণ করা হয়েছে মায়েদা। শরিয়তের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধান এ সুরার মাধ্যমে প্রবর্তন করা হয়েছে।
যেসব খাদ্য হারাম
ইসলাম যা হারাম করেছে, চিরকাল তা হারাম থাকবে। হালাল থাকবে হালাল। হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করা যাবে না। পৃথিবীতে হারামের তুলনায় হালালের সংখ্যা অনেক বেশি। এ সুরার ৩ নম্বর আয়াতে মানুষ কী খেতে পারবে না, তার একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে। যথা—
১. মৃত প্রাণী।
২. (প্রবাহিত) রক্ত।
৩. শূকরের মাংস ।
৪. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে বলি দেওয়া পশু।
৫. যে প্রাণী গলা টিপে বা শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
৬. আঘাতে নিহত প্রাণী।
৭. উঁচু স্থান থেকে পড়ে মৃত।
৮. সংঘর্ষে মৃত।
৯. যে পশুকে হিংস্র জন্তু খেয়েছে। তবে এসব প্রাণী জীবিত জবাই করতে পারলে খাওয়া যাবে।
১০. মূর্তিপূজার বেদির ওপর বলি দেওয়া প্রাণী।
১১. জুয়ার তির দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করা খাদ্য। আরবে তৎকালীন একটি রীতি।
মানুষ হত্যা ভয়াবহ অপরাধ
মানুষকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর সৃষ্টি। ইসলামে মানুষের ওপর চড়াও হওয়া হারাম। মানুষ হত্যা নিষিদ্ধ। মানুষকে গালি দেওয়াও পাপ। কাউকে মৃত্যু থেকে মুক্তি দেওয়া সমগ্র মানবসমাজকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার শামিল। কোরআন এ আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করেছে। তা হলো, মানুষের সমাজ হলো পরিপূর্ণ একটি দেহের মতো। সমাজের প্রতিটি মানুষ হলো সেই দেহের একেকটি অঙ্গ। এই সমাজের একটি অঙ্গের কোনো রকমের ক্ষতি হয় তার প্রভাব অপর অঙ্গের ওপর সুস্পষ্ট হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সে, যার হাতে সকল মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস: ৯)
এ ছাড়া মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক, মানুষের অধঃপতনের কারণ, বন্ধুত্বের নীতিমালা, সমাজসংস্কারের নানা দিক, ইহুদিরা যে কারণে অভিশপ্ত, হিজরতসহ ইত্যাদি বিষয় পবিত্র কোরআনের এ অংশে আলোচিত হয়েছে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক